কেটলিতে আধহেমন্তের সকাল বুড়বুড়ি কাটছে। ঐ ঘাড়ে ঘাড়ে জোলো দুধ আর চিনির ডেলা পড়ল। রং দেখ, যেন সাক্ষাৎ মে মাসের দুপুর। সামান্য শিউরে উঠলেন সাঁপুইবাবু। হাতে হাতে পাচার হয়ে যে ভাঁড়টা এসে পৌঁছল তার খোঁদলে উষ্ণ তরলের ওপর পুরু সর। তাও মুখ দেখার ব্যর্থ চেষ্টা তিনি করবেনই। রোজকার মতন। রিফ্লেক্স।
খুব বেশী বাজেনি। শহর এখনও বিছানায় এপাশ ওপাশ। ক্যামোমাইল চায়ের রং ধরছে রোদে। এডুয়ার্ডো বলত ক্যামোম। সাঁপুইবাবুও একটা আদরের নাম রেখেছিলেন। রাণীর চা। ক্লিওপেট্রার ফেভারিট ছিল নাকি। রোজ রাতে ঐ এককাপ। রাণীও কি ওতে মুখ দেখতেন?
একটু সরে বসলেন। লোকজন বাজারের ব্যাগ ফ্যাগ নিয়ে আসছে। মাছ কুটতে দিয়ে এসে নিমাইয়ের বেঞ্চিতে ওয়েটিং চলবে। আলু পটলের দাম ভিড় করে অন্যদিন, আজ কমলা নিয়ে পড়েছে সবাই। চেতলার ভরা বাজারে সাঁপুইবাবু পাহাড় দেখতে পেলেন। কমলার ঢল শুরু হয়েছে সবে। সোমবার সকালবেলা ফার্স্ট আওয়ারে মীটিং। তাঁর কাপেও কমলা থাকবেই। অরেঞ্জ পিকো। এডুয়ার্ডো আর্ল গ্রে নিয়ে বসত। বেলা অবধি কেটলি কেটলি চা উড়ে যেত। কাঞ্চনজঙ্ঘা সাক্ষী।
নিমাইয়ের দোকানে বিজবিজে ভিড় বাড়ছে। উঠে পড়লেন সাঁপুইবাবু। দুধের ডিপোর সামনে কলেজব্যাগ নিয়ে দুজন। ছেলেটা এককানে হাত রেখেছে। মেয়েটার গালে হালকা গোলাপী। ফার্স্ট ফ্লাশ। গলিতে ঢুকে পড়লেন সাঁপুইবাবু। কণিকা বেঁচে থাকলে ঐ মেয়েটার চেয়ে একটু বড়ো হত।
চেতলার অলিতে গলিতে এখনও এরকম বাড়ী আছে। সাত শরিকের অভিশাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে। প্রোমোটারে ছুঁতে সাহস করে না। সাঁপুইবাবু সাবধানে লকারের চাবি ঘোরালেন। আখরোট কাঠের বাক্স। কাশ্মীরী কাজ। ডালা খুলতেই রাণী হেসে উঠলেন।
টী-সেটটার গায়ে হাত বোলালেন সাঁপুইবাবু। ডাঁটিগুলো সোনার। জাপানের রাজবংশের জিনিস। নিলামে কেনা। তিনি বলে রাখতে পেরেছেন। কণিকার অসুখের সময় বৌ এটাও বেচতে চেয়েছিল। চা বাগান ততদিনে বন্ধ। সাঁপুইবাবু রাজি হতে পারেননি। যার যাবার সে যায় যাক। যমরাজের সাথে পাল্লা দিয়ে লাভ?
বাক্সের কোণে রাখা মসলিনের বটুয়াটা সাবধানে তুললেন তিনি। কণিকাকে পুড়িয়ে সদ্য ফিরেছেন শ্মশান থেকে। এডুয়ার্ডো এসেছিল। ক্যামোমের শেষ প্যাকেটটা দিয়ে বিদায় জানাতে। কথাবার্তার মাঝখানে বৌ বঁটি নিয়ে তেড়ে এসেছিল। সেই তিনি বুঝলেন বৌয়ের মাথাটা গোলমাল করছে। ঝামেলায় প্যাকেটটা আর খোলা হয়নি।
বটুয়াটা এক চিলতে ফাঁক করে বুক ভরে শ্বাস নিলেন সাঁপুইবাবু। সুঘ্রাণ। আজ খাবেন? এককাপ? স্বচ্ছ রোদের রঙে আলো চলকে পড়বে। কাপের মেঝেতে রাণী হাসবেন তাঁর দিকে চেয়ে। ডিনার তো সেই রাতে। নিমাইয়ের মাটিগোলা আর পাঁউ। এখন হবে নাকি এক কাপ? চা?