ভূমিকা
এডগার অ্যালান পো “Hop-Frog” নামে একটি ছোটগল্প লিখেছিলেন, যা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৪৯ সালে। Hop-Frog নামের এক বামন ও বিকলাঙ্গ ব্যক্তি রাজার বিদূষক। তার একমাত্র বন্ধু ছিল ট্রিপেটা নামের এক বামন মেয়ে।রাজা ও তার সাত মন্ত্রী ছিল নিষ্ঠুর ও নৃশংস; Hop-Frog-কে নিয়মিত অপমান করে, জোর করে মদ খাইয়ে মজা লুটত। এক বিশেষ ভোজসভায় Hop-Frog প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ খুঁজে পায়।
হপফ্রগ গল্প হরর, রিভেঞ্জ যত ততটাই মেটাফরিক। রাজা আর তার সাত মন্ত্রীর কাণ্ড দেখে মনে হয়, এরা আদৌ আটটা আলাদা লোক না একই ইউনিট? একটাই রাষ্ট্র, একটাই দফতর, একটাই কুর্সি, সেইরকম না তো? ফ্যাসিজম তো অনেকটা ঐ রাজার মতন, ক্ষমতার মদে দিশেহারা হয়ে যাকে তাকে কামড়ে দেয়। তো কে পারে তার শোধ তুলতে? কী হয় শোধ তোলার পরে? কেমন হয় যদি এই বিন্দুগুলো ঘুরে যায়? পাওয়ার স্ট্রাকচারে যে যেখানে সে সেভাবে তার স্বৈরাচার চালিয়ে যায়, যতক্ষণ তার মেয়াদ। সিংহাসন তার কাজ করে যায়। এইটুকুই?
এই উত্তরগুলো খুঁজেছি আমরা এই গল্পের অনুপ্রেরণায় লিখিত শ্রুতিনাটক বিদূষকে। এখানে নাটকের অংশবিশেষ রইল সংলাপ আকারে।
নির্বাচিত চিত্রনাট্য
রাজা - কৈ, আমার মদের গেলাস খালি কেন? ভর্তি কর, ভর্তি কর। তা ব্যাঙ, আজ ভাঁড়ে নতুন কী ভাঁড়ামো এনেচ বাবা? ওহে মন্ত্রী, আজ ব্যাঙকে দেখে তোমাদের হাসি পাচ্ছে না?
হ্যাঁ মহারাজ
হ্যাঁ মহারাজ
খুব হাসি পাচ্ছে মহারাজ
হাসতে হাসতে পেট ফেটে যাচ্ছে মহারাজ
হা হা হা, ঐ তো কুলোর মত পেট, ধামার মত বুক। লিকলিকে পাছার তলায় আর কিচ্ছু নেই। হা হা হা।
হা হা হা হা
ও হে ব্যাঙ?
ব্যাঙ - আজ্ঞে মহারাজ?
রাজা - তুমি যখন মায়ের পেট থেকে বেরিয়েছিলে, মায়ের পেট থেকে বেরিয়ে বাচ্চারা কাঁদে ঠিক কি না?
ঠিক ঠিক ঠিক
তা, তুমি যখন মায়ের পেট থেকে বেরোলে, তুমি কী করলে ব্যাঙ?
ব্যাঙ - আমি উউউ (শেয়ালের ডাক) করে খানিকটা কেঁদে নিয়েই একটা পোকা দেখতে পেলুম।
রাজা - হা হা হা, ব্যাঙের চোখ। তারপর?
তারপর? তারপর? তারপর?
ব্যাঙ - তারপরে, আমি খপ করে পোকাটা খেয়ে ফেলে, একটা ঢক করে ঢেকুর তুলে গ্যাঙর গ্যাঙ করলুম রাজামশাই।
রাজা - হা হা হা, ঐ, ঐ, দেওয়ালে একটা মাছি বসে আছে, ব্যাঙ?
ব্যাঙ - গ্যাঙর গ্যাঙ। মাছি মাছি। ওটাকে খেতে (জিভ দিয়ে নাল টানার শব্দ করে); মহারাজ, দেওয়াল বাইতে হবে।
রাজা - দেওয়াল? দেওয়াল কারা বায় ব্যাঙ?
ব্যাঙ - বাঁদরে দেওয়াল বায় মহারাজ
রাজা - বাঁদর হও ব্যাঙ
ব্যাঙ - হুপ হুপ হুপ। উউউউ (বাঁদরের গলার আওয়াজ করে) মাছি, মাছি, খাই চাঁছিপুঁছি
রাজা - এই তো, সাবাস, হা হা হা, ব্যাঙ মাছি খাচ্ছে।
হা হা হা
হা হা হা
হা হা হা
ব্যাঙ - ব্যাঙ তারপরে বাঁদরের মত কলাগাছে চড়ে
রাজা - কলাগাছে চড়ে কী? ব্যাঙ?
কী, কী, কী?
ব্যাঙ - দোল খেতে - খেতে, দোল খেতে-খেতে
রাজা - হা হা হা, সাবাশ (হাততালি)
ব্যাঙ - দোল খেতে-খেতে ব্যাঙ দেখল তার ত্রিভুবনে কেউ নেই, সব মরে হেজে গেছে। কোথাও যাবার নেই, কোনো কাজে সে লাগে না। বেকার ব্যাঙ, অকর্মণ্য ব্যাঙ।
রাজা - অকম্মা ব্যাঙ। হা হা, তারপর?
ব্যাঙ - তারপরে ব্যাঙ শুনতে পেল মহারাজ ডাকছেন, আয় -আয়-আয়-আয়
রাজা -
আ আ আ চু চু চু
আ আ আ
চু চু চু
ব্যাঙ - ব্যাঙ শুনতে পেল মহারাজ বলছেন আমায় কে হাসাতে পারে? আমায় কে হাসাতে পারে?
রাজা - কে কে কে?
কে পারে? কে পারে?
ব্যাঙ - ব্যাঙ দোলে-দোলে আর ভাবে-ভাবে। এমন সময় এল মস্ত ঝড়। হাওয়ার দাপটে গোরু ওড়ে, বাঘ ওড়ে, উড়তে উড়তে গোরুটা বাঘকে, না না, বাঘটা গোরুকে চিবিয়ে খেল।
রাজা - হা হা হা, গোরুতেই বাঘ খাক। হা হা হা
ব্যাঙ - গোরুতেই বাঘ খেল। ব্যাঙ কোনোমতে লুকিয়ে চুরিয়ে উড়তে উড়তে এসে পড়ল মহারাজের আসরে।
রাজা - ব্যাঙ?
ব্যাঙ - মহারাজ?
রাজা - গোরুটা তোমার পেছনে নেই তো?
ব্যাঙ - আজ্ঞে না মহারাজ। সেই গরুটা আমি খেয়ে ফেলেছি। সেই থেকে আমার ধামার মত পেট।
রাজা - হা হা হা হা। কেয়াবাৎ ব্যাঙ।
কেয়াবাৎ কেয়াবাৎ
ব্যাঙ হল দুনিয়ার সেরা ভাঁড়। ঢুঁড়ে দেখাক কেউ এমন ভাঁড় আর একটা? বলুক আমার মন্ত্রীরা? পাবে এমন ভাঁড় কেউ?
না না না, কোথাও পাবে না
ব্যাঙ আমাদের সেরা ভাঁড়
এ কি, আমার গেলাস খালি? মদ দাও গেলাসে। তিরি? ফাঁকি দিচ্ছিস আজকাল কাজে?
তিরি - এই যে, মহারাজ। ভরে দিচ্ছি
রাজা - হা হা হা, সত্যি বল তিরি, তুই ও তো বেঁটে বাঁটকুল, তোরও ব্যাঙকে দেখে হাসি পায়?
নাকি, তুই ব্যাঙকে দেখছিলি? আমায় মদ দিতে ভুলে গেলি।
ব্যাঙ - আমাকে দেখে আর হাসি না পেলে আমার কী হবে মহারাজ? ব্যাঙ ভাঁড় ভুঁড়ি শুকিয়ে মরবে
রাজা - হা হা হা, ভুঁড়ি শুকিয়ে মরবে। হো হো হো
তিরি - হি হি হি, ওকে দেখলেই কেমন হাসি পায়। আমি বেঁটে হলেও সুন্দরী। তাই তো মহারাজ আমাকে সেবা করার সুযোগ দেন।
ব্যাঙ - আর আমি বামনকুলের কুলমার্তণ্ড। পেটের মধ্যে একঝুড়ি কুল নিয়ে বসে আছি।
তিরি - হি হি হি
রাজা - হা হা হা। মন্ত্রী? কোন রাজ্যের সেনা ভালো, কোন দেশের মেয়েছেলে ভালো। আমার দেশে কোনটা ভালো?
আপনার ভাঁড় দুনিয়ার সেরা ভাঁড় মহারাজ!
হা হা হা। সেরা ভাঁড়। এই যে ব্যাঙ, এসো এক পাত্তর মদ চড়াও দেখি?
ব্যাঙ - আজ্ঞে মহারাজ, মদ খেলে আমার কষ্ট হয় মাথা ঘোরে
রাজা - হা হা হা, মাথা ঘোরে। আর কী হয়? ব্যাঙ?
ব্যাঙ - বমি হয় মহারাজ
রাজা - হা হা হা, শুনলে, বমি হয় ব্যাঙের। তা, তুমি ক'মাস পোয়াতি হে ব্যাঙ?
কমাস? ক'মাস? ক'মাস?
ব্যাঙ - আজ্ঞে না মহারাজ, পোয়াতি নই। এই যে, (গেলাস থেকে মদ খেয়ে), খেলুম।
রাজা - হা হা হা। নও? তা হলে আরোও মদ খাও। উঁহু, গেলাস আমাদের জন্য।এবারে ঐ জালাটা তোলো, জাম্বুবানের মত শক্তি তো, তোলো তোলো, অ্যা, এবারে খাও। ঢকঢক করে। খালি না করে নামালে মুণ্ডু থাকবে না হে ভাঁড়। তখন? তখন? মরা ব্যাঙ? লাখ টাকা। হা হা হা।
লাখ টাকা, লাখ টাকা, লাখ টাকা
ব্যাঙ - যে আজ্ঞে মহারাজ
তিরি - মহারাজ? ব্যাঙের শরীরটা ভালো নেই, এক কলসী মদ খেলে ও আর বাঁচবে না হুজুর
রাজা - বটে? তুই আমার থেকে বেশি জানিস?
তিরি- না মহারাজ, সত্যি ওর শরীর ভালো নেই। সকালেও জ্বর ছিল গায়ে, আমি নিজে দেখেছি।
রাজা - উউউউউউ, কত দরদ রে, আমার ভাঁড়ের গা কত গরম গিয়ে দেখে এসেছিস? কেন রে, ওকে বে করবি নাকি? পাছার তলায় কিসু নাই, তাকে বে করবি?
তিরি - ( কেঁদে ফেলে) না মহারাজ। আমি কিচ্ছু করব না। দোহাই, ওকে কলসীটা নামাতে বলুন। আর মদ খেলে ও মরে - মা গো
রাজা - ভাঁড়ের ব্যথায় একেবারে বুক টনটন করছে হ্যাঁ? বাঁটকুলি বামন এই নে, তুইও মদ গেল
তিরি - আ আ লাগছে আহ।
রাজা - হে হে, লাগলে হবে? ঘাড়টা এমনি করে কাত করে মদ গিলতে হয়, ঢলানি ছেনাল, বুঝলি?
তিরি - দমফাটা কাশির আওয়াজ