নির্বাচিত চিত্রনাট্য
কথক
ড্যাম, এখানেই রাত একটা। ফটাফট লেখাটা শেষ করতে হবে এবারে। উমরাও আকবরের রাজসভায়। তো গজল দেব? মীরার ভজন তো ঝুনঝুনওয়ালার ভাষায় টুউ ভেজ…ডান্স তো রাখতেই হবে, পাবলিক খাবে না তো নইলে,(হাই তুলে) হুম, উমরাওয়ের ছোটবেলার ইনোসেন্সটাও ভালোভাবে ধরা উচিত, কিডন্যাপ হবার আগে একটা ওয়েল টু ডু ফ্যামিলিতে যে সিকিউরিটি অ্যান্ড কমফর্ট পেয়েছে বাচ্চা মেয়েটা সেটা প্রপারলি এক্সপ্রেস হচ্ছে না (হাই তুলে) টেক্সটটাও তো কেমন একটা লাগছে। তবায়েফ হওয়া চাট্টিখানি কথা না, পাঁচ বছর বয়সে গলায় তান ধরাতেই হয়, কিডন্যাপ করে তা কি সম্ভব? উ-ম-রা-ও জা-ন আ-দা, স্পিক টু মি. কথা বল উমরাও জান, কথা বল।
উমরাও
আরে মেহজাবীন, হামকো গুম করনে কি সিতম করে তো করে কিউ? কৌন মার্ড হ্যায় অ্যাইসা যো উমরাও জান আদা সে হারিফ মুকাম্মল করে?
কথক
কে? কে? কে আপনি? একি! এখানে ঢুকলেন কী করে? আরে, আপনারা কারা? কখন এসে আমার ঘরে বসে পড়েছেন?
(হাসির রোল)
উমরাও
হাম তো আপকে যেহেন মি বসতে হ্যায় মেহজাবীন
গঙ্গামণি
এই ছুঁড়ি, বাইজীদের নিয়ে প্যানপ্যানে নাটক লিখছিস দিনরাত আর এখন আমাদের দেখে ভির্মি খাচ্ছিস? ন্যাকা!
কাপ্তেন মোনা
উমরাওকে নিয়ে আকবরের সামনে এক গঙ্গা কাঁদানোর পাপ করছিস তো, আমরা আর পারলাম না, আজকের মজলিশটা তোর ড্রয়িংরুমেই করব ভাবলাম।
আজিজুনবাই
আরে জনাব, গৌর সে দেখিয়ে আপ। উমরাও আর আমি আলাদা কিছু নই। ডরপোক মির্জা বললই না এই তানপুরা বাজানো হাতে পিস্তল নিয়ে আমি কেমন আংরেজ সিপাহীদের খুলি উড়িয়েছি। আপকো অসলি কহানি সুনানে কে লিয়ে হম তশরিফ লায়ে।
কথক
আমি এসব কী দেখছি, কী শুনছি? অ্যাম আই গোয়িং ক্রেজি?
আজিজুনবাই
হর শকস সে আপ তেজ হ্যায় মগর আপমে পাগলপান ভি তো হ্যায়! তাওয়াইফ নিয়ে এত পঢ়ালিখা করে নাকি কেউ? আংরেজদের আউলাদরা তো আমাদের তাওয়াইফ সে রন্ডি বানা দিয়া , ইতনে মে দুনিয়া শুকরগুজার হ্যায় , আপ কিউ খুশ নেহি ?
কাপ্তেন মোনা
দাঁড়াও, বেটি ঘাবড়ে গেছে। তেহলীজ সে পেশ আতে হ্যায়. এই যে ছুঁড়ি, এইটে হল উমরাও। উমরাও জান আদা।
কথক
অ্যাঁ? কে?
কাপ্তেন মোনা
আর এ হল আজিজুনবাঈ। আমরা তো বলি মির্জা মিনসে এর গল্প শুনেই উমরাও জান লিখেছিল।
কথক
আ-আজিজুনবাঈ?
কাপ্তেন মোনা
হুঁ, মা সরস্বতী আছেন ওর গলায়। নবাব থেকে ইংরেজ সিপাই, আজিজুনবাঈয়ের একখানা গান শোনার জন্য পায়ের তলায় পড়ে থাকত। তারপর মিউটিনির সময় তানপুরা ফেলে ধরল পিস্তল। সিপাহী সেজে বরাবর ঢুকে যেত ঘোড়ায় চেপে। ও ছিল, যাকে বলে ক্র্যাকশট। বাঘা বাঘা লালমুখো বাদামীমুখো অফিসার ওর নাম শুনে ভয়ে পেচ্ছাপ করে ফেলত। হা হা হা হা। যাই হোক, এটা হল গঙ্গামণি।
গঙ্গামণি
গঙ্গাবাঈ বল গো। গিরীশ ঘোষ দেগে দিয়েছিল, বাইজি বলে। অ্যাকটো তো বিনোদিনীও করত, সে হল নটী। আমার কাছে গান শিখে সে হল নটী। আর আমি হলুম বাঈজী। গঙ্গাবাঈ। বুঝলি? কী বুঝলি?
কথক
বিনো - ন-নটী বিনোদিনীর গানের টীচার আপনি?
উমরাও
আর ঐ যে, আমাদের পালি। চুপটি করে বসে আছে দেখ, আমাদের মত dillagi করছে না। ও হল আম্রপালী।
কথক
কে?
আম্রপালী
আম্রপালী। আমি। সন্দেহ আছে?
কথক
ন-ন্না মানে-
কাপ্তেন মোনা
ও তোদের সিনেমা সিরিয়ালের লবঙ্গলতিকা আম্রপালী না, অজাতশত্রুকে ঘোল খাইয়ে বুদ্ধের শরণ নেওয়া আম্রপালী। আড়াই হাজার বছর আগে বৈশালীতে নগরনটীদের বোর্ডিং স্কুল খোলা আম্রপালী। মগধের ইতিহাস পালটে দেওয়া আম্রপালী।
কথক
নাহ, আর অবাক হব না। যদি পাগল হয়ে গিয়েই থাকি, আর তো কিছু করার নেই, লেট মি এনজয় দ্য শো। মন্দ লাগছে না।
আর আপনি? কৈ, আপনার নাম বললেন না?
কাপ্তেন মোনা
আমি? ও গঙ্গা কবুতর, বলে দাও, আমি কে। বকে বকে গলা শুকিয়ে গেছে, একটা একশোর সিগারেট লাগবে।
গঙ্গামণি
একশো টাকার নোট দিয়ে সিগারেট পাকিয়েছিস? ছুঁড়িকে কাপ্তেন বলে কি আর সাধে ডাকত? অ খুকি, উনি হলেন মনোরমা। অর্ধেন্দুশেখরের হাতে গড়া নটী গো। যেমন থিয়েটার করত, তেমনি মুজরো। কম হীরে জহরত কামিয়েছে ছুঁড়ি? দু হাতে রোজগার করেছে, আর দশ হাতে খয়রাতি। তাই ও হল কাপ্তেন মোনা। বুঝলি? কী বুঝলি?
আম্রপালী
মোনা একটা বিস্ময় আমার কাছে। শিশুবয়স থেকে নাড়া বেঁধে সঙ্গীতশাস্ত্র না শিখলে সরস্বতীর আশীর্বাদে অধিকার জন্মায় না। অথচ ওকে দেখ। যেন রাগ মধুবন্তী। এই নাটক ভালো লাগছে তো ঐ চলল সঙ্গীতগুরুর সন্ধানে। গলায় মধ্য-সপ্তকের ষড়জে শম্ বাঁধা। আহা, এমন একটা ছাত্রী পেতাম যদি! নতুন গায়কী তৈরি করে ফেলতাম
কাপ্তেন মোনা
তোমার ছাত্রী হলে তোমার স্কুলের সবচেয়ে ডবকা ছাত্রীকে নিয়ে ইলোপ করতাম। গায়কীতে তীব্র মা ছাড়া আর কিছু পড়ে থাকত না। তা তোমাদের সময়ে মেয়েদের প্রেম করলে মোড়ল জ্যাঠারা গোবর ছুঁড়তেন?
আম্রপালী
প্রেম না থাকলে, শৃঙ্গার না থাকলে গায়কীর বোধ আসবে কেমন করে? সমলিঙ্গের প্রেম নিয়ে আলাদা করে কেউ মাথা ঘামাতেন না, নগরপালিকার শৃঙ্খলায় তো একেবারেই নয়।
উমরাও
ইশক পর জোর নাহি হ্যায় উওহ আতিশ , গালিব। কিন্তু সে দিওয়ানিরা শাদি করতে চাইলে?
আম্রপালী
বিবাহ মানেই বংশরক্ষা। সম্পত্তির উত্তরাধিকার। তাছাড়া নগরপালিকা বিবাহ করতে চাইলে সর্বাগ্রে রাজকোষে ঘড়া ঘড়া কার্ষাপণ আবশ্যক, ঐ তোমাদের একশোর নোটে তো কুলিয়েই উঠত না।
উমরাও
আউর আপপে যো দো দো রাজাও নে দিল লুটায়া উসকা ক্যয়া?
আম্রপালী
রাজার আইন প্রজাদের জন্য। রাজাদের জন্য তো নয়! তাঁরা ইচ্ছা হলে রাণী করেন, ইচ্ছা হলে শূলে দেন। অজাতশত্রুকে বিবাহ করব না বলে গণহত্যার কারণ হয়েছিলাম। বিতৃষ্ণায় বুদ্ধের শরণে এসেছি বলে বৌদ্ধ শ্রমণ শ্রমণাদের অবাধে হত্যা করেছিলেন রাজা। কোনো নিয়মে আটকায়নি।
নবাবজাদাও তো তোমার প্রেমে পড়েছিলেন, তোমার তো হারেম পোষালো না।
উমরাও
নাহ। এত গুস্তাখি একের পর এক হয়ে গেল। কায়র নবাবজাদা বাগাওয়াত করলই না। আমার ফৈজ আলি বেঁচে থাক, আংরেজদের নাকে ঝামা ঘষতে না পারলে মর্দ কিসের?
আজিজুনবাঈ
উমরাও, মিউটিনির সময় আংরেজদের নাকে মর্দরা ঝামা ঘষতে পারে, তবে জেনানারা তাদের নাক কেটে নিয়েছিল। মিউটিনির পরে আংরেজ সরকার এর শোধ তুলেছিল বটে। আমাদের tawaif দের তেহলীজ, কায়দা কানুন সব লুটে নিয়ে গেল ফিরাংগিগুলো। আর কি ঘেন্নার কথা, বলে আমরা, তাওয়াইফরা নাকি বিমারি এনেছি মিলিটারিতে।
গঙ্গামণি
হ্যাঁ, পুলিশ এসে বড় ঝামেলা করত বাপু। সবে একটা শক্ত আলাপ নিয়ে বসেছি, অল্প অল্প করে বশে আনছি, ও মা, একদঙ্গল লালমুখো ব্যাটাছেলে এসে হাজির। সব ঘেঁটেঘুঁটে দেখে হয় না, আবার শুতে চায়। আঁশবঁটি নিয়ে তাড়া করেছিলুম সেবার
কাপ্তেন মোনা
ওদের চোখে বাইজী হল বেশ্যা। সে তো আর আর্টিস্ট নয়, রাণী ভিক্টোরিয়ার জমানায় মেয়েছেলে শোয়ার ঘরের চৌকাঠ পেরিয়েছে কি সে বারভোগ্যা।
আজিজুনবাঈ
আসলি কহানি মিউটিনির পরে লখনউতে শুরু। নবাব তখতে নেই। ট্যাক্স দেনেওয়ালা বচা কৌন? এক সে বঢ়কর এক তাওয়াইফ, আউর কৌন? আংরেজদের দিমাগ ঘুরে গেল। জেনানার হাতে এত্তো পয়সা?
পরবর্তী অংশ শুনুন ইউটিউবে
তথ্যসূত্র
বই
- Veena Talwar Oldenburg. The Making of Colonial Lucknow, 1856-1877. Princeton Legacy Library
- শিবব্রত চট্টোপাধ্যায়. বঙ্গীয় নাট্যশালার ইতিহাস : ১৭৯৫-১৮২০
- অমিত মৈত্র. রঙ্গালয়ে বঙ্গনটী
- বাংলা থিয়েটারের গান. দেবজিত বন্দ্যোপাধ্যায় (সম্পাদনা)
- কুমারপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়. মজলিস