ভূমিকা
দ্রোহকাল একটি ঐতিহাসিক কল্পকাহিনী। গৌতম বুদ্ধের সমসাময়িক এই কাহিনী অজাতশত্রুর রাজত্বের প্রথমদিকের ঘটনাবলীর ওপর আধারিত। চারশ নব্বই খ্রীষ্টপূর্বাব্দ নাগাদ অজাতশত্রুর বৈশালী আক্রমণের পর থেকে মগধের তৎকালীন রাজধানী রাজগৃহে এই কাহিনীর সূত্রপাত। রবীন্দ্রনাথের পূজারিণী কবিতায় যে ঘটনার উল্লেখ আছে, এমনকি বাণী বসুর মৈত্রেয় জাতকের দ্বিতীয় পর্বেও যার আভাস পাওয়া যায়, সেই শ্রীমতির অর্ঘ্যদানের দ্রোহ সম্বল করে শ্রুতিনাটক- দ্রোহকাল। তিন পর্বে প্রকাশিত।
এই কাহিনী আমাদের আসিফা ট্রিলজির শেষ কিস্তিও বটে। তিহার থেকে বলছি এবং শুধু তোমার জন্যর পর আমরা শেষবার দেখা পাব আসিফার।
নাটকের প্রধান চরিত্রে আছেন অজাতশত্রু, দেবদত্ত, শ্রীমতি, আম্রপালী এবং এক বিদেশী।
এখানে নাটকের অংশবিশেষ রইল সংলাপ আকারে।
নির্বাচিত চিত্রনাট্য
ভয়েসওভার
এইমাত্র পাওয়া খবরে প্রকাশ পথ অবরোধ কর্মসূচির প্রধান উদ্যোক্তা আসিফা নকভীকে শমন পাঠিয়েছে আদালত। আমাদের বিশেষ প্রতিনিধি সরাসরি জানিয়েছেন রাস্তা রোকো অভিযানে একাধিক মন্ত্রীর কনভয় আটকে পড়ায় জনপ্রতিনিধিদের নিরাপত্তা নিয়ে সংশয় তৈরী হয়। আসিফা নকভীর বিরুদ্ধে রাজদ্রোহ, দাঙ্গায় উসকানি এবং খুনের চেষ্টার মত গুরুতর অভিযোগ আনা হতে পারে বলে খবরে প্রকাশ। আমরা আমাদের প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলে নেব, আসিফার বিরুদ্ধে অভিযোগ ঠিক কী?
ফেড আউট
ভয়েস ওভার
রাজদ্রোহ, পৃথিবীর ঘৃণ্যতম অপরাধ, কবে থেকে যেন? কৈ, মনে আছে নাকি কারোর? প্রথম রাজা যেন কে ছিলেন? আহা, স্বাধীন ভারতের কথা হচ্ছে না, গণতন্ত্রে রাজা রাণী থাকে না, দ্রোহটুকু থেকে যায়। ওটা বেড়ালের চশমা। ভারী কূটতত্ত্বে গিয়ে কাজ নেই, এইদিকে আসুন। দেখতে পাচ্ছেন, সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা গঙ্গার তীর ধরে ঝকঝক করছে মহাজনপদগুলি? বেশী না, মাত্র হাজার আড়াই বছর পিছিয়ে গিয়েছি আমরা। আর্যজাতির হাত ধরে ভারতবর্ষ শিখছে সভ্যতা কাকে বলে, নইলে মেঘ না চাইতেই জলের এ দেশে মানুষজন তো পাখির থেকে আলাদা কিছু ছিল না, আলোকপ্রাপ্ত মুনি ঋষিরা তো তেমনই দেখেছেন। তো অসভ্য অনার্য, যাঁরা সংস্কৃতকে রাজভাষা হিসেবে ছেদ্দা করেন না, তাঁদের ক্রমশ সেকেন্ডারি সিটিজেনশিপে ঠেলে সরিয়ে গড়ে উঠেছে মহাজনপদ। কুরুবংশ হস্তিনাপুরের মহাভারতীয় ঐতিহ্য নিয়ে স্বতন্ত্র জনপদে সুখী। অশ্বমেধের দিন এখন পালাবদল হয়ে পৌঁছেছে মগধে। বিম্বিসারের শাসনে আদরে অঙ্গ, বঙ্গের কিয়দংশ মগধের শরণে। কোশলরাজ পসেনদি তাঁর রাজধানী অযোধ্যায় রামরাজত্বে সুখী, সম্পর্কে বিম্বিসার তাঁর ভগ্নিপতি। এতদিন বেদ-বুদ্ধ একাসনে রাজানুগ্রহ পেয়ে এসেছেন, তবে কুমার কুনিয়, বিম্বিসারের উত্তরসূরী অজাতশত্রুর শাসনে দিনকাল পাল্টাচ্ছে। কুলোকে বলে বৃজ্জির বিমাতাকে তিনি দুচক্ষে দেখতে পারেন না, হয়ত সেইজন্যই গিয়ে বৈশালী নগর জ্বালিয়ে দিয়ে এসেছেন। সুসজ্জিত উদ্যান নগরীর ছাইভষ্মে বেঁচে আছে একমাত্র একটি আমবাগান। বৈশালীর সবচেয়ে সুন্দর বাগান, তার মাঝখানে ধুকধুক করছে একটি প্রাসাদ। সেখানে বৈশালীর হৃদয় আম্রপালী, জীবিত, সুরক্ষিত।
আসুন, অজাতশত্রুর অন্দরমহলে, জেনে নিই বৈশালী ধ্বংসই যদি করবেন, তাহলে বৈশালীর হৃদপিণ্ডটি সযত্নে তিনি এড়িয়ে গেলেন কেমন করে? আর সদ্য রাজা, হাতে পিতৃহত্যার রক্তের দাগ শুকোয়নি, একটা গণতান্ত্রিক নগরী বেমালুম জ্বালিয়ে দিলেন? কেন? অবশ্য সাবধান, রাজাকে সরাসরি প্রশ্ন করলে আপনি কিন্তু রাজদ্রোহী, গর্দান বাঁচিয়ে।
দৃশ্য এক
(কাতরোক্তি)
জীবক - জানি আপনার কষ্ট হচ্ছে রাজন্, কিন্তু ক্ষতস্থান বিষিয়ে যাতে না ওঠে, আমাকে শোধন করতেই হবে।
অজাতশত্রু - আ আ আহ। কুমার জীবক, তুমি ইচ্ছাকৃত আমাকে যন্ত্রণা দিচ্ছ, আমার পিতার মৃত্যুর শোধ তুলতে চাও? শোধ? আহ, তোমাকে শূলে দিতে পারি, জান তুমি?
জীবক - রাজন্, আমি একজন চিকিৎসক, আমার ধর্ম আপনার সঠিক চিকিৎসা করা। আপনার পিতার প্রতি আমার যা কর্তব্য আপনার প্রতিও তাই।
অজাতশত্রু - তুমি আমাকে কুমার বল না আর।
জীবক - না মহারাজ
অজাতশত্রু - তুমি আমাকে কখনও কুনিয় বলে ডাকনি.
জীবক - দেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গের বৈশিষ্ট্য নিয়ে নামকরণ করা একজন চিকিৎসকের ধর্ম বিরুদ্ধ, রাজন্
অজাতশত্রু - তুমি আমার চেয়ে কিছু প্রাচীন নও, বৃজ্জের তুলনায় তুমি কনিষ্ঠ। তাও তুমি আমার বাঁকা কনুই নিয়ে পরিহাস করে কুনিয় বল না। জীবক, তুমি আমাকে ঘৃণা করনা?
জীবক - মহারাজ, রোগীকে ঘৃণা করলে ধর্মচ্যুত হব
অজাতশত্রু - যখন রোগী ছিলাম না তখন? থাক, শুনতে চাই না এর উত্তর। এসো, শোধন সম্পূর্ণ করে যাও।
জীবক - যথা আজ্ঞা মহারাজ।
অজাতশত্রু - আহ, অম্বপালির গেহের মুখেই আমার পিঠে বর্শা বিঁধে যায়। আমি ঘোড়াসমেত তার গেহে ঢুকে পড়েছিলাম, তারপরে জ্ঞান হতে দেখলাম অম্বপালি আমার ক্ষতস্থান পরিচর্যা করছে। জীবক, সত্য বল, সে কি পরিচর্যার নামে আমার অনিষ্ট করেছে?
জীবক - না মহারাজ। অম্বপালি নিপুণ ভাবে ক্ষতমুখ শোধন করেছেন শুধু তাই না, রক্তপাত বন্ধ করতে তিনি যে উপায়ে পশুর তন্ত্রী দিয়ে গভীর ক্ষতস্থান জোড়া লাগিয়েছেন আমি তাতে চমৎকৃত। চিকিৎসাশাস্ত্রে গভীর অধিকার না থাকলে এ অসম্ভব।
অজাতশত্রু - অম্বপালি আমার প্রাণ বাঁচিয়েছে। আমি তার নগর - উদ্যান ধ্বংস করেছি, তাকে অধিকার করার জন্য আমি কি না করতে পারি। কিন্তু সে, সে -
জীবক - মহারাজ, উত্তেজনা আপনার স্বাস্থ্যের পক্ষে হানিকারক। আপনার বিশ্রাম প্রয়োজন।
অজাতশত্রু - অম্বপালিকে আমার চাই। তাকে না পেলে আমার বিশ্রাম নেই।
জীবক - মহারাজ, উঠবেন না।
অজাতশত্রু - তার এত স্পর্ধা সে আমায় ফিরিয়ে দিল খালি হাতে! কেবল বৈশালী নগরীর হিতাকাঙ্ক্ষায়। যে গণপরিষদ তাকে গৃহবন্দি করেছিল তাদের হিতাকাঙ্খায়। আমার আহত অশক্ত দেহকে সুস্থ করে সে ফিরিয়ে দিল। আমি কুনিয়, তাই?
জীবক - অম্বপালি দেবী দেহগত ত্রুটি দিয়ে মানুষকে বিচার করেন বলে মনে হয় না রাজন্।
অজাতশত্রু - সে জনপথবধূ। সে শপথ নিয়ে বলতে পারে কখনও পিতা এবং পুত্রকে পৃথক ভাবে সে সঙ্গ দেয়নি? আমার পিতার ঔরসে তার সন্তান আছে, তাই সে আমাকে ফিরিয়ে দিল?
জীবক - এর উত্তর হয়ত তিনি নিজেই দিতে পারবেন। আপনি বৃথা কারণ অনুমান করে পীড়া বাড়াবেন না রাজন্
অজাতশত্রু - পিতার ঔরসে সন্তান থাকুক, আমার তাতে কিছু আসে যায় না। পিতা! হাহা! পিতার প্রেম! হাহা হাহা। অম্বপালির বিনিময়ে পিতা বৃজ্জির রাজকুমারীতে রফা করেছিলেন। কাপুরুষ!
জীবক - মহারাজ, আপনার ক্ষত থেকে রক্তপাত হচ্ছে। শান্ত হন।
অজাতশত্রু - আমার পিতা একটি মেষগর্দভ, বুঝলে কুমার জীবক? অম্বপালির গর্ভে তিনি সন্তান দিতে পারেন, তাকে রাণী করতে পারলেন না। আর আমি? পালি তোমাকে অগ্রমহিষী করব আমি, তাও তুমি আমাকে গ্রহণ করবে না? পালি? পালি? আহ।
জীবক - ক্ষমা করবেন মহারাজ, ক্ষতমুখ খুলে গেলে আপনার প্রাণসংশয় হবে। সূচীকাভরণ করতে আমি বাধ্য হলাম।
অজাতশত্রু - পালি! পালি! তুমি নাকি ঐ নষ্ট সন্ন্যাসীটার প্রতি অনুরক্ত? পালি, গণপরিষদকে ছেড়ে দিয়েছি তোমার কথায়, ঐ ভণ্ড ভিক্ষুকে আমি কিন্তু ছাড়ব না। বুদ্ধ , বুদ্ধ, তাকে আ-আমি আমি ….
জীবক - রক্ষী, মহারাজ যতক্ষণ নিদ্রিত থাকবেন কেউ যেন বিরক্ত না করে। আমার বিশেষ নিষেধ রইল। আমি সূর্যোদয়ের পূর্বে আর একবার আসব।
ভয়েসওভার
কুরুক্ষেত্র না হলেও তাহলে মহাভারতের ঐতিহ্য বজায় রেখে অজাতশত্রু একটা নারীর জন্য অল্পস্বল্প যুদ্ধ করেছেন। আম্রপালী। গণতান্ত্রিক বৈশালীর সবচেয়ে বড় সম্পদ আম্রপালী। মগধের কী নেই আম্রপালী ছাড়া? বাণিজ্য আছে, সৈন্য আছে, বেদ আছে, বুদ্ধ আছে, অঢেল সম্পদ আছে, অজাতশত্রুর ভয়াল রথ আছে, অমিতশক্তিধর রাজা আছে, নেই শুধু আম্রপালী। ষোড়শ মহাজনপদের সেরা বিদুষী, সেরা রূপসী আম্রপালী জনপদবধূ কেন হল? কারণ গণপরিষদে তাঁর একাধিক পানিপ্রার্থী ছিলেন। কুন্তী পাঁচ সন্তানের মধ্যে বধূ ভাগ করে দিয়েছিলেন। বিশ্বের প্রাচীন গণতন্ত্র বৈশালী তার মহাবিদূষী নাগরিককে সমস্ত জনপদের মধ্যে বাঁটোয়ারা করে দিল। আম্রপালীর অবশ্য তর্কশাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি ছিল, তার প্রাপ্য পারিশ্রমিক সহস্রমুদ্রা, নগরীর সেরা আম্রকানন, সুরক্ষিত যৌন-সম্পর্কের প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে তার জনপদকল্যাণীর পেশা স্বীকার। এর
আড়াইহাজার বছর পরে জনপদকল্যাণীরা হাড়কাটা গলিতে সুরক্ষিত যৌন সম্পর্ক চেয়ে মার খাবেন, সামাজিক সুরক্ষা চেয়ে ঘাড়ধাক্কা খাবেন, ভবিষ্যতের সঞ্চয় রাখতে গিয়ে ঠকবেন। ঠিক কবে যেন জনপদকল্যাণীরা হয়ে উঠবেন বেশ্যা, ইতিহাস তা মনে রাখার দায় নেয়নি। আমরাও নেব না, চলুন বরং রাজগেহের পথে ঘুরে আসি এক চক্কর, কী বলেন?
দৃশ্য দুই
ফুলওয়ালি - এসো মা, এসো। কুঁচবরণ কন্যে গো মেঘবরণ কেশ। চাঁপা, জুঁই, পলাশ গোড় দিয়ে রেখেছি গো মা, আহা, অমন চাঁদপানা মুখে এমনি করে চুল বাঁধলে তবেই না মিনসে নাগরের মন পিছলে যায়?
শ্রীমতি - ফুল নেব ভগবন বুদ্ধের অর্চনার জন্য গো মাসসী, নাগর মিনসেকে আর পিছলে ফেলে দিয়ে কাজ নেই
ফুলওয়ালি - ও মা, তাই বললে হয়? তোমার ঝিগুলান গেল কৈ? সোমথ্থ ঝিয়ের দল মাথে ফুল গুঁজে ঘুরবে আর তুমি মা রাজরাণী উদলা চুলে ঘুরে বেড়াবে?
শ্রীমতি - আহ মাসসী, আমার ধবলীর কাল সারা রাত বেদনার পর এই সকালে ফুটফুটে বাছুর বিইয়েছে। আমার সখীদের ধবলীর কাছে রেখে এসছি। তুমি দেরী করিয়ে দিও না মাসসী, অমিতা ঠিক বেরিয়ে যাবে তারপরে। দাও আমাকে কনকচাঁপা, এই থাল ভরে দাও। আর আর…
গান
তক্ষসিলার কাঁকই চিরন সাবথ্থির ঐ চাঁপা
আরে যতন করি বাঁধলি মাথা তাও তো বাঁকা সিঁথা
পেঁচপাড়িয়া রাজকুমারী গলায় চন্দ্রহার
দিনে দিনে বাড়ছে তোমার চুলেরই বাহার
ফুলওয়ালি - কি জানি বাপু, আজকাল নাগর মানাতে কচি কচি মেয়েমানুষদের মন নাই দেখি। সব ঐ নেড়ামুণ্ডি সাধুটার দোষ। কচি কচি মাথা গুলা চিবিয়ে খেলে। খালি ধম্ম আর ধম্ম। আরে বাপু এই বয়সে ধম্মই যদি করবে তবে কম্ম আর কবে করবে? ভারী দিনকাল পড়েছে এক।
শ্রীমতি - ও কি, মাসসী, অমন করে বোলো না। ভগবন আমাদের ইষ্ট ছাড়া কখখনোও অনিষ্ট করবেন না। আচ্ছা এবারে তিনি এলে নিয়ে যাব তোমাকে তাঁর কথা শুনতে। তারপর দেখব মাসসীর মন আর নাগরে থাকে কিনা। আচ্ছা, ও কি ফুল গো মাসসী? কি সুন্দর। আগে তো দেখিনি? আহ, কি মিষ্টি গন্ধ।
ফুলওয়ালি - জানি নে বাছা ও কি ফুল। বিদেশী ফুল হবে। দিচ্ছি তোমায়। ঐ যে চাঁদপানা ছোকরা ওদিকে মশলা বেচছে, ও দিল বটে। কি যেন নাম বলল, কি যেন,
আচ্ছা, ও ভালোমানুষের পো, ও সোনামুখ নাগর আমার, এই যে আমার সনাতন, মাসসীর দিকে একটু চাও বাপধন। এই যে, এই ফুল কোথথেকে পেয়েছ বাছা?
বিদেশী - এই যে মাসসী, ফুল তোমাকে চুলে বাঁধতে দিয়েছি। নামে কি আসে যায়। যে নামে ডাকো তারে, ও ফুল মধু বিতরে।
শ্রীমতি - দেখ তো মাসসী, কি কাণ্ড তোমার। উপহার পাওয়া ফুল নিয়ে আমি কী করব? রাখো তুমি।
ফুলওয়ালি - ও লো, ও মুখপোড়ার কথার ধারাই অমন। আমার মাথায় এত চুল নাই যত এই ঝুড়িতে ফুলের কাঁড়ি। বল না বাছা, কী ফুল, দেখ রাজরাণী আমার রেগে যাচ্ছে।
বিদেশী - নমস্কার রাজরাণী, সুপ্রভাত। মাসসীর মাথায় চুল কম বলে আপনি রেগে যাচ্ছেন?
শ্রীমতি - সুপ্রভাত। আমি রাজরাণী নই, আর আমি অপরিচিত লোককে আমার রাগ দুঃখ বলতে যাই না। মাসসী, ও ফুল তুলে নাও, আমার লাগবে না
বিদেশী - ঐ যাঃ, রাজরাণী নয়, তবে কি রাজকন্যা? বেয়াদবি করে ফেললাম। আমার গর্দানটা থাকবে তো?
শ্রীমতি - বলা যায় না, আপনাকে গুপ্তচর বলে ধরিয়ে দিলে ও গর্দান নাও থাকতে পারে। এই নাও মাসসী, এক পণই রাখ, পুন্নিমার আগে আর দিচ্ছি না।
বিদেশী - সর্বনাশ! রাজকন্যা, এ যে লঘু পাপে গুরু দণ্ড! এক গোছা বসরাই গোলাপের নাম বলতে দেরী হওয়ায় গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ? দোষ খণ্ডনের সুযোগও না দিলে - অন্তত মাসসীর কথাটা ভাবা উচিত। সোনামুখ নাগর শূলে চড়লে মানুষটার বুক ফেটে যাবে যে!
শ্রীমতি - বড় বাচাল আপনি, সঙ্গে সঙ্গে আসছেন কেন আমার?
বিদেশী - গর্দান আপনার হাতে নিশ্চিন্তে ছেড়ে আসব, রাজকন্যা?
শ্রীমতি - প্রথমত আমি রাজকন্যা নই। দ্বিতীয়ত আপনি আরোও দেরী করিয়ে দিলে আমি প্রহরীদের ডাকব। আর তৃতীয়ত, আরে আরে, আপনি মাটির ওপর বসলেন যে?
বিদেশী - শেষ পর্যন্ত এই গোলাপের গোছা না নিলে সত্যিই মনে করব অপরাধ করেছি।
শ্রীমতি - এ যে নাছোড়! বেশ, যেমন বুদ্ধের ইচ্ছা (হেসে), নিলাম আপনার ফুল।
গান - কালো জলে কুচলা তলে ডুবল সনাতন
আজ চারানা কাল চারানা পাই যে দরসন।।
অমিতা -শ্রীমতি, শ্রীমতি, সখী, তোকে রাজমহিষী খুঁজছেন। এত বিলম্ব কেন? শ্রীমতি, ওমা, এ কেমন ফুল?
শ্রীমতি - এই এক বিদেশী বণিক দিল, সে গেল কোথায়? এই তো ছিল এখানে?
অমিতা -বিদেশী বণিক বিদেশী ফুল দিয়ে যাচ্ছে লক্ষণ ভালো নয় শ্রীমতি, বসন্ত সমাগত দ্বারে, আজি দখিন দুয়ার খোলা, এস হে...
শ্রীমতি - রঙ্গ করিস নে, অমিতা। তোর বসন্তসঙ্গীত রাখ গে, সুবর্ণকত্তা ফেরত এলে শোনাস গেয়ে। চ, রাজমহিষী অপেক্ষা করছেন। অর্চনার বেলা পেরিয়ে যাচ্ছে।
অমিতা - এসো হে এসো হে এসো হে, আমার বিদেশী এসোওওও
শ্রীমতি- জোরে জোরে গা। তোর কাছেই আসবে, বেশ। বেশ হবে।
ভয়েস ওভার
এই সন্দেহজনক বিদেশীর গল্পে আসছি না হয়, তবে এই যে শ্রীমতি, অমিতা এরা রাজমহিষীর সঙ্গে চলেছে অর্ঘ্য দিতে, বেদ-ব্রাহ্মণ কি এঁদের ভালো চোখে দেখবেন? ভারতবর্ষে আর্যাবর্তের পত্তন হয়েছে সদ্য, মহারাজ হতে গেলে শুদ্ধরক্তের ক্ষত্রিয় হতেই হবে এমন নিয়ম চালু হতে এখনও কিছু চাঁদ বাকি। তাও হোম যজ্ঞের আড়ম্বরে বিরক্ত কেউ কেউ চাইছেন ধর্ম সংস্কার, কেউ ভাবছেন ধর্ম দিয়ে যদি রক্তক্ষয় নিবারণ করা যায়। যথাযথ বোধি লাভ করলেন কে? তীর্থঙ্কর? তথাগত? না কি দেবদত্ত? যখন মহাজনপদ রুদ্ধশ্বাসে বুদ্ধের উত্থান দেখছে, ইতিহাস লিখে রাখছে রাজধর্মে লোকধর্মের প্রভাব, প্রতিক্রিয়া। সনাতন হিন্দু ধর্মে সংস্কারের বানভাসি। বেথলেহেমের আস্তাবলে তখনও মেরীর কোলে আরেক যুগাবতার আসতে দেরী ঠিক চারশ নব্বই বছর। ধর্মের নামে নরহত্যার উৎসব সাড়ম্বরে শুরু করতে ইতিহাস সাগ্রহে তাকিয়ে আছে অজাতশত্রুর দিকে।
পরবর্তী অংশ শুনুন ইউটিউবে
পর্যালোচনা এবং উল্লেখ
- Indian Express Indulgeডিসেঃ 24, 2021