ভূমিকা
শ্রুতিনাটক তিহার থেকে বলছি রবিপ্রেমের ফসল। রবীন্দ্রনাথের তিনটি উপন্যাস শেষের কবিতা, ঘরে বাইরে এবং চতুরঙ্গের কিছু অংশ এক কাল্পনিক চরিত্র আসিফার দৃষ্টিতে পাঠ করব আমরা। আসিফা এক রাজবন্দী। লাবণ্য, বিমলা, দামিনীর অন্বেষণে তার জীবনের শেষ মুহূর্ত মিশে যায়।
রাজবন্দী আসিফার মোট তিনটি উপাখ্যান আছে, তিহার থেকে বলছি তার প্রথম কিস্তি। নাটকের মৌলিক অংশটি রইল।
নির্বাচিত চিত্রনাট্য
আসিফা
জেলর ম্যাডাম,
আপনাকেই লিখছি, চমকাবেন না। দেখুন, আমি রাজবন্দী। সলিটারি সেল থেকে চিঠি তো ছাড়ুন, চিঁটিও বেরোবার উপায় নেই। খবরের কাগজ চাইলাম, আপনি দিল্লাগি করে এনে দিলেন বাংলা বই। নাক উঁচু করে বললেন উমদা কিতাব, পঢ় লিজিয়ে। ভেতরে বুকমার্ক দেখেছি, আপনার বাড়িতে কোনো ছোটো ছেলে বা মেয়ের কিতাব। আপনি দিয়ে গেলেন, ভাবলেন কয়েদী নম্বর দোসোপনরাকে উল্লু বানালাম কেমন। এই খোট্টা দেশে বাংলা জানা আসামী? তাও রাজবন্দী? হা হা হা। আপনি কীকরে জানবেন রবীন্দ্রনাথ নিয়ে কি সোরাব রুস্তম হয়ে গেছে আমার একজনের সঙ্গে। উঁহু, নাম বললে আপনারা আবার তাকে নিয়ে পড়বেন। বলব না। আচ্ছা ধরুন সে - বিশ্রী। কেমন সুন্দর নাম? সে এত পুরোনো কথা ভাবি সে কি এই জনমে নাকি আগের জনমের কথা। বিশ্রী বলত, রবিঠাকুর নাকি তার প্রাণের আরাম। আমি স্নাব করে বলতাম, মানুষকে যে কাজ ঠাকুর বানায় সে কাজে কোনো দিলচসপি নেই আমার। পড়িনি, বলেছিলাম এই সব মাশি লাভ লাভ থিংস নিয়ে দূর হও।
দূর হয়েছিল, কিন্তু তার আগে বাংলাটা সেই শিখিয়েছিল। যাতে কোনোদিন রবীন্দ্রনাথ পড়তে ইচ্ছে হলে...কেমন শিখিয়েছিল বলুন তো?
বিশ্রীকে ভোলার জন্য বাংলা ভুলেছিলাম, কিন্তু - ভুলতে পারলাম কই?
একটা গান খুব গাইত, ঝুলনা ঝুল, না না, - ফুল- ফুলডোরে বাঁধা ঝুলনা। মনে পড়ছে। আজ বড্ড মনে পড়ছে।
গান
আসিফা
জেলর ম্যাডাম,
প্রেমে পড়েছি মনে হচ্ছে। আর এ সব দোষ আপনার। এই শেষবেলায় এসে শেষের কবিতা পড়তে দিয়েছেন দেখে নিজের ওপর একটু সিমপ্যাথি, একটু সেলফ পিটি বাড়াচ্ছিলাম।
এখন পড়তে পড়তে আমার বাংলা, আমার বিশ্রী, আমার ভুলি বিসরি জীবন আস্তে আস্তে ফিরে আসছে।
লাভ স্টোরি, শুনেছি খুব নামডাক, পপুলার লাভ স্টোরি যেমন হয় ভেবে রেখেও দিতাম কিন্তু -
কিন্তু পড়তে শুরু করে; কেমন দিল আনচান করছে। কাল ওরা আমার সঙ্গে কথা বলে গেল। আলাদা আলাদা করে। অমিত আর লাবণ্য। জ্বর আসছিল, রোজকার মত, কিন্তু ব্যথাটা আর বোধ হয়নি। অমিত বলে চাইলে এই কুঠুরিতেও পাহাড় দেখা যায়।
আজ ওরা আসবে না? আমার জ্বর আসুক, ওদের দেখব, কথা বলব।
আমি কার প্রেমে পড়লাম? জেলর সাহিবা?
শেষের কবিতা পাঠ-অভিনয়
গান
আসিফা
দিদি,
আজ অনেকদিন পরে বেশ লাগছে। মনে হচ্ছে পুরো রবীন্দ্রনাথ শেষ করে আপনাকে বাজি হারাব। এই যে আপনি ঘরে-বাইরে পড়তে দিলেন, সরকার বাহাদুর জানলে আমার মাথার সঙ্গে আপনার কানটাও নেবে কিন্তু। তা সে আমার মাথা এমনিই আজ আছে কাল নেই, আপনার কানের বন্দোবস্ত আপনিই বেশ রকম করবেন না হয়, কিন্তু এ যে একেবারে আগুন! সন্দীপের মত ঘুণ ধরেই যে বিপ্লবের ভিতটা আলগা হয়ে যায়, আপনার প্রভুরা সেটা বেশ ভালো বোঝেন, তাই না? বিমলাদের ফাঁদ পেতে ধরা যায়, কোল্যাটারাল ড্যামেজ পড়ে থাকে নিখিলেশ, গ্রামকে গ্রাম দাঙ্গায় উজাড় হয়, জঙ্গলকে জঙ্গল খনিতে। তাই তো? কেমন সহজ অঙ্ক! দেখি আরেকবার, এই জায়গাটা - বিমলার আত্মকথা। বার বার পড়তে ইচ্ছে করে।
ঘরে-বাইরে পাঠ-অভিনয়
গান
আসিফা,
আজকাল ওরা আমাকে ঘিরে থাকে। জ্বর আর ছাড়ে না, ওরাও আমাকে ছেড়ে যায় না। একটা একটা করে উপন্যাস শেষ করেছি, এক এক করে ভরে উঠেছে আমার চারপাশ। কোথায় রে তোদের সলিটারি সেলের কাগুজে বিধান? কোথায় তোদের সেপাইদের পাহারা? আয় রাষ্ট্র, দেখে যা, তোদের কয়েদী নম্বর দোসোপনরাকে ঘিরে রেখেছে লাবণ্য, বিমলা, এলা, সুচরিতা। দামিনী আসবে আজ। পাগলী মেয়ে। খালি গুমরে মরে। আমার কাছে এলে রেখে দেব আমার করে, আমার বুকের ভেতরে, কোথাও যেতে দেব না।
আমি মরে গেলে আর জন্মে পাব তোমাকে, বিশ্রী? আমি নাস্তিক, জন্মান্তরে বিশ্বাস করতে মানা। কী হবে আমার?