ঘটনা নব্বই-একানব্বই সালের। সেদিন গার্জেনদের ডেকেছিলেন রেবাদি। তখনও তিনি ব্রহ্মচারিণী রেবাদি, সারদা আশ্রমের হেডমিস্ট্রেস। ছোটো করে বড়দি। প্রব্রাজিকা সারদাপ্রাণা হবেন আরও কয়েক বছর পর। ছোটোখাটো চেহারার শান্তশিষ্ট মানুষটি ভয়ানক ব্যক্তিত্ব নিয়ে এসে দাঁড়ালে ক্লাসশুদ্ধু দামাল মেয়েরা শান্ত হয়ে যেত, তাদের বাবা মায়েদের কথাই আলাদা। তো সেদিন বড়দি মেয়েদের গার্জেনদের ডেকে বললেন বাচ্চাদের ভালো করে খেতে দেবেন। একটা ডিমসেদ্ধ অন্তত দেবেন। মর্নিং সেকশন, সকালের খিদে নিয়ে পড়তে পারবে না। কয়েকজন মা কুঁইকুঁই করে বললেন এত সকালে মেয়েদের দুধ বিস্কুট ছাড়া কিছু খাওয়ানো যায় না। বাস্তবিক, ওয়ান থেকে ফোর আমাদের সকাল ছটা দশের মধ্যে ঢুকে যেতে হত। সকালে ভারি ব্রেকফাস্ট করে স্কুলে যাওয়া অসম্ভব ছিলো। বড়দি ভুরু কুঁচকে বললেন, “টিফিনে দিয়ে দেবেন। ওদের ডিম দেবেন, পেট যেন ভর্তি থাকে।”
অকুস্থলে অনেকেই আঁতকে উঠেছিলেন, যেমন আমার মা।
বই জিনিসটা আমাদের বাড়িতে ভয়ানক পবিত্র মানা হত। তার সঙ্গে ডিম মানে পাপ, প্রলয়, সরস্বতীর বিদায়। এমনিতেই মাস্টারদের বাড়ি, পবিত্রতার অগ্নিপরীক্ষা চলত প্রতি পদে। মাছ ডিম পিঁয়াজ রসুন সব এঁটো কাঁটা বস্তু, মুরগির মাংস হেঁসেলে নিষিদ্ধ, ভাত ব্যাপারটাও সকড়ি। রান্না বান্না খাওয়া দাওয়া সব হত মিলিটারি ডিসিপ্লিন মেনে, ঠেকাঠেকি হলেই অনুকূল ঠাকুর বোঁ বোঁ শব্দে প্রতিকূল হয়ে যাবেন, নিরামিষের সর্বনাশ। আবার প্রথম থেকে রান্না করতে হবে, তেমনটাই নিয়ম।
এই গোটা নিয়মের জোয়াল কাঁধে নিয়ে দৌড়তেন যিনি, সেই আমার মা এতটাই অ্যানিমিক ছিলেন যে রাস্তাঘাটে মাথা ঘুরে যাবার মতন ঘটনাও হয়েছে। মাথা ঘুরে যাবার ব্যাপারে থিসিস করেছিলো আমার ক্লাসের শ্রীপর্ণাও। তার টিফিনে ডিমসেদ্ধ থাকলেও সে খেতে চাইত না, লোভী বন্ধুদের খাইয়ে দিতো। হিমগ্লোবিন তাই সদাই সিঙ্গেল ডিজিট।
এই যে শ্রীপর্ণা, আমার মা, এরা সবাই কি ব্যতিক্রম? আমি কি আজ আমার জীবনের স্যাড স্টোরি শোনাতে বসেছি? না তো! আমি আজ এই পোড়া দেশের ঝলসানো ভবিষ্যৎ দেখাতে বসেছি। এই যে ধরুন কিছু সংখ্যা, যেমন ৩৫.৫%, ১৯.৩%, ৬৭.১%।
একটা দেশের ভবিষ্যৎ পরিমাপ করতে হলে তার শিশুদের শরীর মাপতে হয়। WHO এবং UNICEF মাপের জন্য নির্ধারণ করেছে স্টান্টিং (বয়স অনুযায়ী উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম), ওয়েস্টিং (উচ্চতার তুলনায় ওজন অনেক কম), আন্ডারওয়েট (বয়স অনুযায়ী ওজন অনেক কম) এবং অ্যানিমিয়া (রক্তাল্পতা)। NFHS-5 (২০১৯-২১) ডেটা বলছে ভারতে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে স্টান্টিং ৩৫.৫%, ওয়েস্টিং ১৯.৩%, আন্ডারওয়েট ৩২.১%। এই তিনটি সূচকে উন্নতি হয়েছে NFHS-4-এর তুলনায়। কিন্তু অ্যানিমিয়া ৫৮.৬% থেকে বেড়ে ৬৭.১% এ পৌঁছেছে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে। অর্থাৎ প্রতি তিনটি শিশুর দুটিই রক্তাল্পতায় ভুগছে। এবার এই অবধি থামলেই হবে না। NFHS-5 অনুযায়ী ১৫-১৯ বছর বয়সী কিশোরীদের ৫৯.১% অ্যানিমিয়ায় আক্রান্ত। NFHS-4-এ যা ছিলো ৫৪%। অর্থাৎ পরিস্থিতি উন্নত হয়নি, বরং খারাপ হয়েছে। ২৮টি রাজ্যের মধ্যে ২১টিতে এবং ৮টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মধ্যে ৫টিতে কিশোরীদের অ্যানিমিয়া বেড়েছে। এর মধ্যে ইউএন আবার কেলেঙ্কারী করে বসেছে। ২০২৪ সালে তাদের রিপোর্ট জানিয়েছে ভারতে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ওয়েস্টিং রেট ১৮.৭%, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। স্টান্টেড শিশুর সংখ্যা ৩.৭ কোটি।
এবার একটা খুশির খবরে আসি। ২৯ মে ২০২৬ তারিখে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় NFHS-6 প্রকাশ করেছে। স্টান্টিং NFHS-5-এর ৩৫.৫% থেকে কমে ২৯.৩%-এ নেমেছে। আন্ডারওয়েট এখনও প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। ওয়েস্টিং-এ উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। আর সেইটা? সেই অ্যানিমিয়া? আজ্ঞে উহা আর নাই। ভ্যানিশ। এই সার্ভেতে অ্যানিমিয়ার বায়োমার্কার ডেটা সংগ্রহ করা হয়নি। ফলে শিশু ও কিশোরীদের রক্তাল্পতার হালহদিশ পাওয়া যাচ্ছে না।
অ্যানিমিয়া তাহলে আর নেই?
কি মজা কি মজা! NFHS-6-এ অ্যানিমিয়ার ডেটা বাদ দেওয়া হয়েছে ঠিক সেই মুহূর্তে যখন পশ্চিমবঙ্গে মিড ডে মিল থেকে ডিম বাদ যাচ্ছে। ডিমোক্রেসির উদয়ের পথে একটা ফোকলা পরিসংখ্যান, নেহাত কাকতালীয় তো নয়!
এখন অনেক অনেক বিরিয়ানি লাভার ছ্যাড়ছ্যাড় করে ঘি পড়ছে, ভ্যাড়ভ্যাড় করে মাংস পড়ছে ইত্যাদি রিল লাইক করে এসে মুখ মুছে প্রশ্ন তুলছেন স্কুলে গেলেই কি খেতে দিতে হবে? বাড়িতে খাবে, স্কুলে ডিম খাবার নোলা কীসের?
সরল প্রশ্ন, 'শিশু পড়তে আসছে, খেতে নয়। খাওয়ানোর দায়িত্ব পরিবারের, রাষ্ট্রের নয়।' শুনতে বুদ্ধিমানের সাশ্রয় বাণী মনে হয়। কিন্তু অর্থনীতি এবং স্বাস্থ্যনীতি দুটোই বলছে এই যুক্তি ভুল এবং বিপজ্জনকভাবে ভুল।
মস্তিষ্কের কাজের জন্য গ্লুকোজ দরকার। সকালে না খেয়ে আসা শিশুর রক্তে শর্করা কম থাকে। ফলে মনোযোগ, স্মৃতি এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা সবই কমে। এটা অভিযোগ নয়, নিউরোসায়েন্সের তথ্য। গবেষণায় বারবার দেখা গেছে, স্কুলে পুষ্টিকর খাবার পাওয়া শিশুরা একই দিনের বিকেলের পরীক্ষায় ভালো ফল করে।
তাহলে খাওয়া এবং পড়া আলাদা করা যায় না। ভুখা পেটে পড়া হয় না, এটা দর্শন নয়, শরীরবিজ্ঞান।
তাহলে সরকার খেতে না দিলে পরিবার খাওয়াবে, এই তো দাবি! কিন্তু হুজুরে আলা, বাচ্চার পরিবারটা কোথায়? ভারতে যে শিশুরা সরকারি স্কুলে পড়ে, তাদের বেশিরভাগ পরিবার দারিদ্র্যসীমার কাছাকাছি বা নিচে। সেই পরিবার সকালে শিশুকে পুষ্টিকর ব্রেকফাস্টে সফট বয়েল্ড এগ, পোচ, সানি সাইড আপ, ওটস, টোস্ট, ড্রাই ফ্রুটস, স্মুদি দিতে পারে না। তাদের নেই ঘর, টাকা নেই, সময় নেই। যে শিশুর পরিবার তাকে ভালো টিফিন ভালো ব্রেকফাস্ট খাওয়াতে পারে, সে বেসরকারি স্কুলে পড়ে। সরকারি স্কুলে আসা মানেই তার শিক্ষায় রাষ্ট্রের সাহায্য দরকার।
এবার স্কুল মিলকে দাতব্য মনে করলে এটাকে খরচ মনে হয়। তখন সাশ্রয় করতে মন চাইতেই পারে। হাজার হলেও আপনার আমার কষ্টের ট্যাক্সের টাকা! কিন্তু অর্থনীতির ভাষায় এরে কয় human capital বিনিয়োগ — যার রিটার্ন দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রই পায়। পুষ্টিহীন শিশু বড় হলে কম উৎপাদনশীল নাগরিক হয়, বেশি অসুস্থ হয়, স্বাস্থ্য ব্যয় বাড়ায়। অর্থাৎ আজ মিড ডে মিলে খরচ না করলে ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যখাত ও সামাজিক সুরক্ষায় আরও বেশি খরচ করতে হবে।
তাছাড়া ধরুন একটি গরিব পরিবার হয়তো জানেই না যে আয়রনের অভাবে তার মেয়ের মনোযোগ কমছে। কন্যাশিশুর পাতে ডিম মাছ পড়ে না, কারণ সে মেয়ে। সে মেয়ে অঙ্ক বুঝতে পারছে না। এমন প্রতি জেনারেশনে হয়েছে। মেয়ে বাচ্চাদের এনিম্যাল প্রোটিন দিতে হাত ব্যথা করে, টিফিন দিতে আলস্য ধরে। মেয়েরা লেখাপড়ায় পিছিয়ে যায়।
শিশুর পুষ্টিতে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ তাই শুধু ন্যায়সঙ্গত নয়, অর্থনৈতিকভাবে ক্রিটিকাল। জাপানের স্কুল লাঞ্চ সিস্টেম আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এই সিস্টেম পুষ্টি, স্বাস্থ্যবিধি এবং খাদ্য শিক্ষা এই তিনটিকে একসঙ্গে ধরে রেখেছে। প্রতিটি স্কুলে রেজিস্টার্ড নিউট্রিশনিস্ট বা ডায়েট-নিউট্রিশন শিক্ষক আছেন যাঁরা বয়স অনুযায়ী মেনু তৈরি করেন।
ফিনল্যান্ড ১৯৪৮ সালের বেসিক এডুকেশন অ্যাক্টের মাধ্যমে প্রি-প্রাইমারি থেকে আপার সেকেন্ডারি পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীকে প্রতিটি স্কুলদিন বিনামূল্যে গরম খাবার সরবরাহ করে আসছে। ভারতের স্বাধীনতার এক বছর পরে ফিনল্যান্ড স্কুল মিলকে আইনগত অধিকারে পরিণত করেছিল।
ব্রাজিল ২০০৯ সালে স্কুল লাঞ্চ প্রোগ্রাম দেশের ৪ কোটি শিশুর কাছে পৌঁছে দেয়। ব্রাজিলের বিশেষত্ব হলো স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি খাবার কেনার নীতি। এতে শিশু পায় তাজা সবজি, কৃষক পায় নিশ্চিত বাজার।
এবারে এ কথা তো সবাই জানে এদেশে তিরিশ বছরের বেশি সময় ধরে চলছে মিড ডে মিল। সরকারি তথ্য অনুযায়ী মিড ডে মিল প্রতি বছর ১২ কোটিরও বেশি শিশুর কাছে পৌঁছায়। বিশ্বের বৃহত্তম স্কুল ফিডিং প্রোগ্রাম বলে কথা। কাগজে-কলমে বিশাল কীর্তি।
স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব নিয়ে গবেষণায় নিশ্চিত হয়েছে যে মিড ডে মিল দিয়ে অপুষ্টি কমেছে এবং ওজন, মনোযোগ ও শেখার ফলাফলেও উন্নতি হয়েছে। বিশেষত মেয়েদের ক্ষেত্রে স্কুলে ভর্তির হার বেড়েছে এবং ড্রপ আউট হার কমেছে। বিশেষত খরা, অজন্মার মতো বিপর্যয়ের শিকার পরিবারের শিশুদের জন্য বড় মাপের স্বাস্থ্যলাভ নথিভুক্ত হয়েছে।
কিন্তু এখানেই গল্প শেষ নয়। ২০২৪ সালের গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সে ভারত ১২৭টি দেশের মধ্যে ১০৫তম স্থানে রয়েছে, এবং প্রায় ২০ কোটি মানুষ অপুষ্টির শিকার — যা মোটামুটি ব্রাজিলের সমগ্র জনসংখ্যার সমান।
মুম্বইয়ের একটি গবেষণায় ৪০০ জন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুর মধ্যে দেখা গেছে ২১.৭৫% অপুষ্ট, ২৫.২৫% স্টান্টেড এবং ১৮.২৫% ওয়েস্টিং-এর শিকার — এবং এটি মিড ডে মিল স্কিম চলা সত্ত্বেও। তাহলে তিরিশ বছর পরেও কেন এই ছবি? মিড ডে মিল কি তাহলে অ্যানিমিয়া কমাতে পারে?
হ্যাঁ, পারে। খুব পারে। তবে সঠিক উপাদান থাকলে। ওডিশার ঢেংকানলে একটি এক্সপেরিমেন্টে দেখা গেছে মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট পাউডার (MNP) বা ফোর্টিফাইড রাইস (FRK) মিশিয়ে মিড ডে মিল দেওয়ার ফলে ৩ বছরেরও কম সময়ে শিশু অ্যানিমিয়া উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
বিহারে পরিচালিত একটি গবেষণায় ডাবল-ফোর্টিফাইড সল্ট (আয়রন ও আয়োডিন) মিড ডে মিলে ব্যবহার করে হিমোগ্লোবিন স্তর বৃদ্ধি এবং অ্যানিমিয়া ২২% কমানো সম্ভব হয়েছে। যে শিশু বেশি স্কুলে এসেছে, সে বেশি উপকৃত হয়েছে।
অর্থাৎ মিড ডে মিল শুধু পেট ভরানোর কাজ নয়, সঠিকভাবে পরিকল্পনা করলে এটা জাতীয় অ্যানিমিয়া নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে। কিন্তু সেটার জন্য দরকার আয়রন-সমৃদ্ধ খাবার, ডিম, সবুজ শাক, পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ চাল। সেগুলোকে মেনু থেকে বাদ দিলে এই সুযোগ নষ্ট হয়।
শিশু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
চিকিৎসাবিজ্ঞান স্পষ্ট বলছে গর্ভাবস্থা থেকে শুরু করে দুই বছর বয়স পর্যন্ত সময়ে পুষ্টির অভাব হলে তার ক্ষতি অনেক ক্ষেত্রেই অপূরণীয়।
কিন্তু ৬-১৪ বছর বয়সও গুরুত্বপূর্ণ। শিশুরা ভরপেট পুষ্টিকর খেতে পেলে তারা ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারে, শেখার কাজে অংশ নিতে পারে এবং তথ্য আরও ভালোভাবে মনে রাখতে পারে, যা সরাসরি একাডেমিক পারফরম্যান্স উন্নত করে।
মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট নিয়ে এখানে একটা বিশেষ কথা। আয়রনের অভাব (অ্যানিমিয়া) ভারতের সবচেয়ে বড় শিশু-স্বাস্থ্য সংকটগুলোর একটা। মুম্বইয়ের গবেষণায় সবচেয়ে বেশি শিশু যে রোগে ভুগছে তা হলো অ্যানিমিয়া — ২২.৭৫%। অথচ আয়রন ঘাটতির সহজ সমাধান আছে — ডিম, সবুজ শাকসবজি, ডাল। কিন্তু মিড ডে মিলের বাজেটে যা আছে তাতে এই বৈচিত্র্য কঠিন।
বিশেষজ্ঞরা আরও একটা বিষয়ে জোর দেন: ডিওয়ার্মিং এবং মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সাপ্লিমেন্টেশন। কৃমি থাকলে যত ভালো খাবারই দাও না কেন, শরীর তা শুষে নিতে পারে না। তাই মিড ডে মিলের সঙ্গে ডিওয়ার্মিং এবং মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সাপ্লিমেন্টেশনকে যুক্ত করা জরুরি।
এখন আপনি হাই তুলে বলতেই পারেন দেড়শো কোটির দেশ কী করতে পারে?
আপনার হাই খুবই বাস্তব। কারণ ভারত জাপান নয়, ফিনল্যান্ডও নয়। আমরা বিকশিত ভারত কিন্তু গরিব দেশ। তবু কিছু নির্দিষ্ট পথ আছে যা তাত্ত্বিক নয়, দেশের মাটিতেই পরীক্ষা করা যায়। যেমন?
মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠী-দের দিয়ে মিড ডে মিল রান্না। স্থানীয় মেয়েরা পূর্বনারীদের থেকে রান্নার কৌশল শিখেছেন। বাচ্চাদের পুষ্টির দায়িত্ব তাঁদের ওপর থাকলেই তো নিশ্চিন্দি! স্থানীয় ফার্ম-টু-স্কুল লিংক। স্থানীয় চাষীদের থেকে সরাসরি স্কুলে সবজি কেনা। কীটনাশক মুক্ত দিশি খাবারের উপকারিতা শিশুদের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
সিলেবাসে খাবার থাকুক। শুধু দু গ্রাস গেলা তো নয়, খাবার সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়াও তো জরুরি! কোন খাবার কেন খেতে হয়, কীভাবে রান্না করতে হয়, কোন শস্যের কী গুণাগুণ, দেশি শস্য, দেশি সবজি, দেশি ফল, এনিম্যাল প্রোটিন, উদ্ভিজ্জ প্রোটিন কোন মরসুমে খেলে, কার সঙ্গে কোনটা খেলে কী উপকার এই তো স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতির গুরুত্ব। এই বিষয়গুলো পাঠ্যক্রমে যুক্ত হলে দীর্ঘমেয়াদী সুস্বাস্থ্যের ভিত্তি তৈরি হয়। আর এ দেশের মাটিকে আরও আরও ভালবাসাও যায়।
আর দরকার ক্লাস ৮-এর পরেও মিড ডে মিল।
বর্তমানে ৬.৪৮ কোটি শিশু (ক্লাস ৯-১২) এই প্রকল্পের বাইরে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন ক্লাস ১২ পর্যন্ত সম্প্রসারণের খরচ হবে বার্ষিক ₹১৮,০০০-২২,০০০ কোটি। জাতীয় বাজেটের তুলনায় এটা কম নয়, কিন্তু পনেরো লাখ কোটির স্ক্যামের চেয়ে সংখ্যাটা কমই দেখাচ্ছে, তাই না?
এতো গেলো কোনটা করা উচিত। বদলে কী কী করা হচ্ছে?
২০২৫ সালের মে মাস থেকে কুকিং কস্ট রিভাইজ করা হয়েছে — প্রাইমারি ক্লাসের জন্য প্রতি শিশু প্রতি স্কুল দিনে ₹৬.৭৮, আর আপার প্রাইমারির জন্য ₹১০.১৭ বরাদ্দ।
২০২৫ সালে মিডিয়ায় প্রকাশিত রিপোর্টে ধারাবাহিক গলদ ধরা পড়েছে। বিহারে যেমন পচে যাওয়া খাবার খেয়ে ৫০ জন ছাত্র হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। ২৫% স্কুলে নিম্নমানের খাবার পরিবেশিত হচ্ছে কারণ তহবিল আসছে দেরিতে, আর ১০% নমুনায় কীটনাশকের চিহ্ন মিলেছে।
কেন্দ্রীয় বাজেটে মিড ডে মিলের বরাদ্দ ২০১৪-১৫ থেকে ২০১৯-২০ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে কমেছে বা স্থির থকেছে — মন্ত্রণালয় যা চেয়েছে তার থেকে প্রতি বছর কম পেয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি এডজাস্ট করলে দেখব বরাদ্দ কমেছে। ২০২৪-২৫ থেকে বরাদ্দ বাড়ছে, কিন্তু জিডিপি বা মোট বাজেটের অনুপাতে শেয়ার কমেছে।
এর মধ্যে এসেছে ইস্কন-এর সাথে যুক্ত Akshaya Patra Foundation (APF)। তারা ২০০০ সাল থেকে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে মিড ডে মিল সরবরাহ করে আসছে। বর্তমানে তারা ২১টি রাজ্যে ৫২টিরও বেশি কেন্দ্রীয় রান্নাঘর চালায়। ইস্কন-এর কলকাতা শাখার 'অন্নমিত্র ফাউন্ডেশন' এই পাইলট প্রজেক্টে যুক্ত হচ্ছে।
APF-এর দাবি: তারা সাত্ত্বিক, স্বাস্থ্যসম্মত, উচ্চমানের খাবার সরবরাহ করে। APF তাদের 'সাত্ত্বিক' দর্শন অনুযায়ী রান্নায় আমিষ খাবার, পেঁয়াজ ও রসুন ব্যবহার করে না। ২০১৮-১৯ সালে কর্ণাটকে বিতর্ক শুরু হয় যখন The Hindu রিপোর্ট করে যে শিশুরা এই বিস্বাদ খাবার খেতে চাইছে না এবং অনেকে বাড়িতে খাবার ফিরিয়ে আনছে। কর্ণাটক সরকারের নির্দেশিকায় পেঁয়াজ-রসুন রাখার কথা থাকলেও APF তা মানেনি।
Right to Food Campaign এবং Jan Swasthya Abhiyan সরাসরি বলেছে: 'ধর্মীয় বিধান শিশুর পুষ্টির অধিকারের উপরে স্থান পেতে পারে না।' তারা দাবি করেছে APF-এর সমস্ত সরকারি চুক্তি বাতিল করতে হবে। অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা, কর্ণাটক এবং আসামে এই আন্দোলনের চাপে ইস্কন-এর সাথে চুক্তি বাতিল বা পুনর্বিবেচনা হয়েছে।
কিন্তু শিশুদের অপুষ্টি কি কেবল গরিব বাচ্চাদের ওপর প্রযোজ্য?
আয়নার উল্টোপিঠে ঝকঝক করছে Double Burden of Malnutrition। World Obesity Atlas ২০২৪ অনুযায়ী ভারতে ২০ বছরের কম বয়সী ৩ কোটি ৩০ লাখ শিশু কিশোর ওবেসিটির শিকার। Comprehensive National Nutrition Survey, ২০১৬-১৮ ডেটা অনুযায়ী শিশু ওভারওয়েট ও ওবেসিটির হার ০-৪ বছরে মাত্র ১.৬%, কিন্তু ১০-১৯ বছর বয়সীদের মধ্যে তা ৪.৮%-এ পৌঁছায়। উল্লেখযোগ্যভাবে এই সমস্যা বেশি ধনী পরিবার ও শহুরে এলাকায়।
চেন্নাইয়ের একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় (জানুয়ারি-এপ্রিল ২০২৫) ১৩-১৮ বছর বয়সী ২২২ জন কিশোরের মধ্যে ওভারওয়েট ও ওবেসিটির হার ২১.৭%। ঝাড়খণ্ডের রাঁচিতে (জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২৪) বেসরকারি স্কুলে এই হার ৩০.২%।
কেন বলুন তো? বেসরকারি স্কুলের বাচ্চারা কী এমন খায়?
ভারতে আলট্রা-প্রসেসড ফুড বিক্রি ২০০৬ সালে ছিল ৯০ কোটি ডলার, ২০১৯ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩,৭৯০ কোটি ডলার — বার্ষিক ৩৩% বৃদ্ধি। চিপস, কোল্ড ড্রিংক্স, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, প্যাকেটজাত বিস্কুট শহরের স্কুলগামী শিশুর নিত্যসঙ্গী। ইংল্যান্ডে সেকেন্ডারি স্কুলে ৭০% ক্যালোরি আসে আলট্রা-প্রসেসড খাবার থেকে, ভারতের শহুরে স্কুলে এই সংখ্যা গুনলে আরও বেশি আসবে, তাই কেউ গোনেন না। চিকিৎসকরা আরও বলছেন: বেশি স্ক্রিন টাইম, কম শারীরিক কার্যকলাপ, ঘুম কম, এই তিনটে মিলে শহুরে ধনী পরিবারের শিশুর মেটাবলিজম বিগড়ে যাচ্ছে। একই দেশে এক শিশু না খেয়ে স্টান্টেড, আরেক শিশু বেশি খেয়ে ওবেস — দুটোরই মূলে আছে পুষ্টিশিক্ষার অভাব এবং রাষ্ট্রের নীতিগত উদাসীনতা।
প্রশ্ন উঠতে পারে — মিড ডে মিল কি ওবেসিটি বাড়াতে পারে? না, কারণ সরকারি স্কুলে যারা পড়ে তারা মূলত গ্রামীণ ও দরিদ্র পরিবারের শিশু — যাদের মধ্যে অপুষ্টিই প্রধান সমস্যা। শহুরে বেসরকারি স্কুলের শিশুদের মধ্যে ওবেসিটির ঝুঁকি বেশি, কিন্তু তারা মিড ডে মিলের আওতার বাইরে। তাদের বাবা মায়েদের একটা অংশ বিরিয়ানি সাঁটাতে সাঁটাতে বাচ্চাদের আম, আলুমাখা, দুধ, ভাত এক থালায় পরিবেশনের ভিডিওতে গিয়ে বিধান দিয়ে ফেলেছেন মিড ডে মিল ফালতু খয়রাতি, বাড়ি থেকে খাওয়াতে না পারলে বাচ্চা দেবার কী দরকার? বাড়ি থেকে খাওয়াতে পারলেও কি পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানো যায় গো দীনবন্ধু?
এমন মানবজমিন রইল পতিত, আবাদ করলে ফলত সোনা!
তথ্যসূত্র
- PM POSHAN / মিডডে মিল
- IBEF PM POSHAN Report | India Brand Equity Foundation (IBEF), Department of Commerce, Ministry of Commerce and Industry, Government of India
- NFHS ডেটা
- NFHS-5 (2019-21) অফিশিয়াল রিপোর্ট [pdf] | National Family Health Survey, Department of Health and Family Welfare, Ministry of Health and Family Welfare, Government of India
- India's Progress on Malnutrition and Non-Communicable Diseases: Insights from NFHS (2005-06 to 2019-21) [pdf] | UNICEF, India
- Global Hunger Index India 2024
- ICMR Dietary Guidelines 2024 [pdf] | National Institute of Nutrition, Department of Health Research, Ministry of Health and Family Welfare, Government of India
- UK School Food Standards | Department for Education, Government of UK
- School Meals Coalition
- WHO শিশু পুষ্টি নির্দেশিকা (Child Growth Standards)
- Jan Swasthya Abhiyan / Right to Food Campaign
- ISKCON / Akshaya Patra বিতর্ক
- NFHS-6 অ্যানিমিয়া বাদ দেওয়ার বিতর্ক
- NFHS-6 Fact Sheets [pdf]
- Under Fire Over Exclusion of Critical Data from NFHS-6, Govt Now Says Report ‘Not Final’ | The Wire
- What is lost and gained in NFHS-6 | The Hindu
- NFHS-6: Controlling Data to Control the Narrative | People’s Democracy
- Suppressing data? NFHS-6 factsheet drops anaemia, cancer, HIV indicators | South First