জ্ঞান কথাটাকে তিব্বতে কী বলে?
'ডাক', একটি তিব্বতী শব্দ। এর অর্থ জ্ঞান।আর এই ডাক থেকে কোন শব্দ এসেছে? ডাকিনী, অর্থাৎ, জ্ঞানী মহিলা।
কিন্তু ডাকিনী যোগিনীর নাম পেত্নী শাঁকচুন্নী পিশাচিদের সঙ্গে এক ব্র্যাকেটে বসিয়ে দিলে চলবে না। একদল কায়াহীন,ছায়া-ছায়া, হতেও পারে নাও হতে পারে টাইপ, আর আর একদল যে নির্ভেজাল রক্ত মাংসের ভাত রুটি ফল পাকুড় মাস মচ্ছি খাওয়া ঘোর বাস্তব!
ভয় পাচ্ছেন? ওই ভয়টাই তো ভুলিয়ে দিয়েছে আমাদের শিকড়ের ইতিহাস! আমরা ভুলে গেছি এই ডাকিনী, যোগিনী এ কেবল গা ছমছম গল্পের চরিত্র নয়! একেবারে সামাজিক ভাবে স্বীকৃত পদবী। বেজায় খাটনি করে অর্জন করতে হয়।
ডাকিনী, ডাইনী, এই শব্দ গুলোর সঙ্গে কিভাবে যেন জড়িয়ে গেছে ঘোর অনিষ্ট,.ভয়, আতঙ্ক আর মৃত্যুর দাগ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আমরা কেমন দাগিয়ে গিয়েছি এই আশ্চর্য পেশাকে, ঝেঁটিয়ে বার করে দিয়েছি সভ্যতার ঐ পারে। মানে ঐ যে সভ্যতার চারাগাছটার গোড়া পিতৃতন্ত্র দিয়ে বাঁধানো আর কি!
সে অনেক অনেক আগের কথা। গুহা থেকে বেরিয়ে মানুষ তখন সবে হাঁটি হাঁটি পা পা করে আগুন টাগুন ধরাতে শিখেছে। হাতুড়ি আবিষ্কারও হয়ে গেছে - লতার মাথায় পাথর বেঁধে, শিকার ঝলসে খাচ্ছে, দল করে থাকছে, আর বুঝতে পারছে এক মোক্ষম সত্য। দল যত ভারী, তত বেশি নিরাপত্তা। আর দল ভারী হয় কি ভাবে? ঐ যে? ঐ মাদীগুলো কি সব জানে। কি যেন করে। থেকে থেকে ওদের পেট ফুলতে শুরু করে, আর সেখান থেকে বেরিয়ে আসে ছোট ছোট মানুষের ছানা। তারা বড় হতে থাকে, আর দল বাড়তে থাকে।
আদিম পৃথিবী নাকি দীর্ঘ দিন বুঝতে পারেনি সন্তানের জন্মে পুরুষেরও ভূমিকা আছে। তাই মেয়েদের তারা গোড়ার দিকে বেশ ভয় করে সমীহ করেই চলত, মনে করত ওসব বুঝি কোনও অলৌকিক শক্তি, গুপ্ত বিদ্যা। কারণ পুরুষ চাইলেও তা করতে পারছেনা।
ফলে যতসব অতিপ্রাকৃত, দৈবী, অলৌকিক, এককথায় যা কিছু ব্যাখ্যার অতীত, তার কৃতিত্ব বল আর দায়ভারই বল, সব এসে পড়ছে এই বেচারা অবলা রমনীকুলের এর ঘাড়ে। বাকি গল্প তো বেশ সরল। গর্ভধারণ, মাসিক রক্তপাত, সন্তান পালন এই সবের জন্য মেয়েদের শিকারে যাওয়া কমে এল, গুহায় থাকা বাড়তে লাগল। উদ্বৃত্ত সময় তারা করে কী?
ঐ যে? বীজটা মাটিতে পড়লে নতুন চারা গজায়? কেমন করে? সৃষ্টির গোড়ার কথা আর কি!
চাষাবাদ। প্রথমে পর্যবেক্ষণ, তারপর পরীক্ষা নিরীক্ষা আর শেষমেশ আবিষ্কার। এবং শুধু চাষাবাদ নয়, পশুদের দেখে দেখে গাছপালা লতাপাতার আশ্চর্য সব গুণ আয়ত্ত করা, গাছের আঁশ থেকে কাপড় বোনা, গুহার গায়ে বাইসন আঁকা, মানে যাকে বলে কিনা বৌদ্ধিক সব কাজকর্ম।
তা দিব্যি সব চলছিল। মেয়েরা আশ্চর্য সব কীর্তি ঘটিয়ে হয়ে উঠছিল রহস্যময়ী, জাদুকরি, লব্ধ জ্ঞান ধরিয়ে দিচ্ছিল পরের প্রজন্মের নারীর হাতে অতি গোপনে, সংকেত আর হেঁয়ালীর মাধ্যমে। এমন সব কান্ড দেখে ভয়ে ভক্তি তে তাদের মাথায় তুলে রাখল আদিম মানবের দল। কিন্তু গোল বাঁধল পরে। কালেদিনে পুরুষ.যখন ধরে ফেলল সন্তান জন্ম মেয়েরা একা একা পারে না, পুরুষের ভূমিকা সেখানে নেহাত ফেলনা নয়, তখন আর কি! তুড়িলাফ! পুরুষের না আছে মাসিকের জন্য কোনও বাঁধাবাঁধি, না আছে পেটে বাচ্চা নিয়ে বুকে দুধ নিয়ে সন্তানের সঙ্গে বাধ্যতামূলক জুড়ে থাকা, এককথায় মুক্ত বিহঙ্গ। ব্যস আর কি! ওদিকে সভ্যতা চলছে এগিয়ে। আদিম সমাজ নগর সভ্যতার অমৃত চেখেছে, শুধুমাত্র প্রাণরক্ষা নয় ক্ষমতার আগ্রাসনে যুদ্ধজয়ের উল্লাসে মেতেছে , সম্পদের ওপর ব্যক্তিগত মালিকানার নিশান উড়িয়েছে, এবং হাড়ে হাড়ে বুঝেছে সংসারে বাহুবলের গুরুত্ব। এবারে বাহুর সংখ্যা বাড়াতে হলে ধড়ের সংখ্যাও বাড়াতে হবে। তাহলে কী?
নারীর গর্ভও পুরুষের সম্পদের অংশ হতে হবে। বংশে পুরুষের অধিকার কায়েম হবে। প্রজন্মের পরিচিতি থাকবে পুরুষানুক্রমে। ফলে নারীর জীবনের মূল উদ্দেশ্য হয়ে উঠল লাগাতার সন্তান উৎপাদন এবং তাদের প্রতিপালন।
তাহলে সেই অতুল জ্ঞানের কি হল?
কেন? যত বেশি জানে, তত কম মানে! শুনিসনি? ফলে স্বাভাবিক ভাবেই নগরসভ্যতা ঐ জ্ঞানকে ভয় পেতে শুরু করল। যে নারী আগুন ধরাতে জানে, বীজ চেনে, ওষুধ জানে তাকে সন্দেহের চোখে দেখা শুরু হল। ওরা মায়াবিনী, কুহকিনী। রাজাকে ছলনায় ভুলিয়ে পথভ্রষ্ট করে গভীর জঙ্গলে নিয়ে যায়। তার পর কুচুত করে গলায় দাঁত বসিয়ে রক্ত চুষে খায়। ওরা রাক্কুসি!
আর সেই আদিম সময় থেকে চলে আসা জ্ঞান চর্চার পরিসর তথাকথিত সভ্য সমাজের বাইরে খানিক গোপনে খানিক নিভৃতে সরে যেতে থাকল, পাহাড়ে জঙ্গলে নানা আদিবাসী জনজাতির মধ্যে, কিছু নির্দিষ্ট পদ তৈরি হল ঐ বাবদ, যাদের ভবিষ্যত দুনিয়া চিনবে ডাকিনী বা যোগিনী নামে।
পণ্ডিতেরা বলেছেন ডাকিনী শব্দের মূলে আছে ডাক, একটি তিব্বতী শব্দ। যার অর্থ জ্ঞান। অর্থাৎ ডাকিনী হলেন, জ্ঞানী মহিলা। মতান্তরে ডাকিনী নাকি আসছে সংস্কৃত দিয়াতে শব্দ থেকে, যা কিনা ওড়া বা উড়তে পারা বোঝায়। ওদিকে ডাকিনী শব্দের তিব্বতী সমার্থক হল খন্দ্রোমা, যার অর্থ আকাশচারিণী। চিন বা জাপানেও ডাকিনীর কাছাকাছি শব্দগুলোর অর্থ মহাকাশে চলে ফিরে বেড়ানো মহিলাকে বোঝায়।
এই বিষয়টা বেশ তাজ্জব না? ডাইনী আসে ঝাঁটা চেপে, গাছ চালিয়ে বা বাবা ইয়াগার মতো হামানদিস্তায় চেপে, আকাশপথে। বিলিতি ডাইনিরাও তো সচরাচর স্হলপথ ব্যবহার করে না। কেন?
এটা বড় ধাঁধা। ডাকিনী বিদ্যার অলৌকিকত্বের মাত্রা বোঝানোর জন্য হয়ত এই আশ্চর্য ধারণা তৈরি করা হয়েছে। বলা মুশকিল। ভুললে চলবে না, ডাকিনী পরিচিতির মূলে আছে রহস্যময় গুপ্তবিদ্যা। বিশেষ করে বৌদ্ধ তান্ত্রিকসমাজে ডাকিনীরা ছিলেন অত্যন্ত সম্মাননীয়া, চুরাশি সিদ্ধর কাহিনীতে তাঁদের সিদ্ধসাধিকা ও গুরু, দুটি ভূমিকাতেই একাধিকবার দেখা গেছে।
এখানে স্বয়ং শাক্যমুনির দীক্ষিতা জ্ঞান ডাকিনী নিগুমার কথা না বললে দেবী ভারতী রুষ্ট হতে পারেন!
কে এই নিগুমা?
ভারতবর্ষে সহজযান ধারা শতপুষ্পে বিকশিত করার পুরোধা নিগুমা। হেবজ্রের উপাসক তিনি, বিক্রমশিলার অধ্যাপক ছিলেন নিগুমা। লিখেছেন চর্যাপদ এবং আরও অনেক গ্রন্থ। কয়েকটা নাম শুনবি? উপায়মার্গচণ্ডালিকাভাবনা, চক্রসম্বরমণ্ডলবিধি, প্রণিধানরাজ, মহামরজ্ঞান…ইনি রীতিমতো ঐতিহাসিক চরিত্র!
পরের দিন দেবী থেকে ডাইনি পর্ব দুই, আমরা বলব নিগুমার কথা, বলব এযুগের সরস্বতীদের কথা।
তাহলে আজ এই অবধিই থাক রসমঙ্গল? আমাদের জ্ঞানের দেবী মানবী সকলের পাতে পিঠেপুলি থাক? আমরা মনে রাখি অন্নের সুষম বন্টনেই মঙ্গল।
প্রকৃত রসমঙ্গল।