ডাকিনীবিদ্যার কথায় বামপন্থার একটা কথা উঠেছিল, মনে আছে? আচ্ছা এই মারি কি সেই মারি হয়ে ছুটে আসার আগে আর এক ধাপ এগোই? উঁকি মারা যাক বজ্রযানী গুহ্যসমাজতন্ত্রের দুনিয়ায়। এ এক অভূতপূর্ব মহাযোগ শ্রেণীর তন্ত্র, যে তন্ত্র বামাচার অনুশীলন যেমন মদ, যৌনাচার ও শ্নশান সাধনার মতো নিষিদ্ধ ব্যবহারের মাধ্যমে ক্রোধী দেবতাকে আহবান করতে শেখায়! বামাচার, অর্থাৎ কিনা বাম হাতের পথ!
কাজেই লগুড় হাতে এগিয়ে আসার দরকার নেই, বুঝলেন? এ বামপন্থা সে বামপন্থা নয়! এ হল যা কিছু প্রচলিত পদ্ধতির বিপরীতে। প্রচলিত পদ্ধতি বলতে দক্ষিণাচারী পন্থা। তাহলে বামাচারের ভাগে পড়ল, কী?
কুখ্যাত পঞ্চ ম-কার। মদ্য (মদ), মাংস, মৎস্য (মাছ), মুদ্রা (শস্যকণা) এবং মৈথুন। কী? জমে যাচ্ছে তো বিষয়টা?
হুঁহুঁ বাবা। এখনও জমতে ঢের দেরী। আমরা ছিলাম ডাইনী বা ডাকিনীবিদ্যায়। তা মাঝপথে বাঁ হাতি রাস্তাখানা নিলাম কেন? কারণ ঐ যে বজ্রযান শাখার থেকে উদ্ভূত হবে সহজযান শাখা, মোটামুটি আট থেকে বারোশ' খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে। এই মতবাদ অনুযায়ী, "বজ্রগুরু" নামে পরিচিত একজন প্রধান গুরুর মাধ্যমে পরম সুখ বা "সহজ" লাভ করা সম্ভব। এই বজ্র ধারার আদি ও পরমগুরু শাক্যমুনি স্বয়ং, যাঁর থেকে সরাসরি শিক্ষা লাভ করেন সেই আশ্চর্য বিদুষী, নাম নিগুড়া পা বা নিগু মা, উপাধী জ্ঞান ডাকিনী। রীতিমতো ঐতিহাসিক চরিত্র!
তবে অত বছর আগের অমন বিরাট ঐতিহাসিক চরিত্র, তাঁকে ঘিরে অজস্র গল্পকথা গড়ে উঠবেই। যদিও নিগুমা ব্যতিক্রম নন সেই সময় বহু নারী তন্ত্র সাধকের উল্লেখ পাওয়া যায়, তাঁদের উপাধী ডাকিনী বা যোগিনী। যোগসাধনার মধ্য দিয়ে যাঁরা সিদ্ধি লাভ করছেন, তাঁরা যোগিনী। ইয়ে মানে ‘ইয়োগা’ প্র্যাকটিস করলেই হবে না আর কি, যোগদর্শন এক বিবাট বিষয়, চিত্তবৃত্তিনিরোধ শিক্ষা করতে হবে। ডাকিনী শব্দটা আরও ভজঘট। তন্ত্রমার্গে শরীরমধ্যস্থ মূলাধার চক্র, যেখানে কুলকুণ্ডলিনী শক্তি সুপ্ত অবস্থায় থাকেন, সেই চক্রে অধিষ্ঠান করেন ডাকিনী শক্তি। যাক সে কথা, যোগসর্পের হাঁড়ি বেশি না খোলাই ভালো। মোট কথা নিগুমা ছিলেন জলজ্যান্ত প্রজ্ঞা বা জ্ঞানের মূর্ত প্রতীক, বিভ্রমের দেবী, অদ্বৈত মাতৃকার পুজারিণী। লোকে তাঁকে ডাকে কৃষ্ণা ডাকিনী নামে, ঘোর কালো তাঁর গায়ের রঙ, তাঁর সর্বাঙ্গে হাড়ের মালা, একহাতে নরকপাল অন্যহাতে খাঁড়া। কি, চেনা চেনা লাগছে?
আপ ক্রোনোলজি সমঝ লিজিয়ে। বাংলায় সহজযান তন্ত্রের বিপুল জনপ্রিয়তার মূলে ঐ কৃষ্ণাঙ্গী ডাকিনী। মাতৃপূজক বাঙালি খুব সহজেই বজ্রযোগিনীর সাধনক্রমকে আপন করে নিল। নাঢ়োপা ও নিগুমা নাঢ়া নাঢ়ী নামে প্রসিদ্ধ ছিলেন। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয়ের মতে এঁদের নাম থেকেই সহজিয়া সাধক সাধিকারা বাংলায় নেড়া নেড়ি নামে পরিচিত। এই সময়েই সহজযানের চর্যাপদে নৈরাত্মা, বজ্রযোগিনী, জাঙ্গুলি ডোম্বী, চণ্ডালী, শবরী রূপে বর্ণিত হচ্ছেন। কালী পূজিত হচ্ছেন নৈরাত্মা, চর্চিকা ও বজ্রযোগিনীর মণ্ডলে। এই ধারাটিই মধ্যযুগের সূচনাকালে সেনযুগের শেষে মা কালীর বর্তমান রূপ নির্মাণ করবে; যা আজও বাঙালির প্রাণের সাথে বাঁধা। মোদ্দা কথা হল বাঙলার আদি জনজাতির বিদ্যাধরীরা মিলেমিশে যাচ্ছেন সহজিয়া তন্ত্রের ডাকিনী যোগিনী অবতারের মধ্যে। যেহেতু সেই সব বিদ্যধরীরাও জানতেন নানা গুপ্ত বিদ্যা, শেকড় বাকড় লতা পাতার গুণ, হাওয়া বাতাসের গতিবিধি, চাঁদ সুর্য তারার অবস্থান, আরও কত কি - তাই তাঁদের সেই সব বিদ্যাও কালে দিনে ডাকিনী বিদ্যার সঙ্গে সমার্থক হয়ে যেতে থাকে।
ওদিকে প্রাচীন বাংলায়, চাষী, জেলে, ডোম, যোদ্ধা, শিকারি, ধাতুশিল্পীর বাংলায় শক্তিসাধনা এমনিতেই মাতৃকেন্দ্রিক - মনসা, চন্ডিকা, অন্নপূর্ণা, বাসুলী, জাঙ্গুলী, হারিতী, বনবিবি, হাড়িমা, এমন সব দেবতা যাঁদের অনায়াসে মা বলে ডাকা যায়।
এই সিলেবাস থেকে আসুন পোস্ট কলোনিয়াল যুগে ল্যান্ড করি। সরস্বতী মানেই এতদিনে খুব ভালো করে জানা হয়ে গিয়েছে ফুটফুটে ফর্সা মাটি নড়ে তো মেয়ে নড়ে না গুডি গার্ল। আমাদের বেদ উপনিষদের দর্শন বলেছিল বটে কিছু নতুন শিখতে গেলে পুরনো বিদ্যা স্মৃতি থেকে মুছতে হয়। কর্পোরেট ভাষায় যারে কয় আনলার্নিং। আর নতুন কিছু করতে গেলে সাদা ব্ল্যাঙ্ক ক্যানভাসই লাগে আর তাই সরস্বতী হলেন সাদা, কিন্তু সেসব এখন অতীত। এখন পাঁচতলা মল পুরোটাই বর্ণবাদ। উপনিষদের দর্শন পাখা মেলে উড়ে গেছে, পড়ে আছে ফর্সা রং। রইল বাকি দাঁত নখ আর জিভের ধারটুকু, ঔপনিবেশিক উকো দিয়ে ঘষে ফসসা করে দিয়েছেন কবিকুল, এই আর কি!
তাই বিংশ শতাব্দীর কল্লোল যুগে কী শুনলাম আমরা? কবি বুদ্ধদেব বসু লিখলেন,
বলতে পারো সরস্বতীর মস্ত কেন সম্মান?
বিদ্যে যদি বল তবে গণেশ কিছু কম যান?
সরস্বতী কী করেছেন? মহাভারত লেখেননি,
ভাব দেখে তো হচ্ছে মনে তর্ক করাও শেখেননি।
তিন-ভুবনে গণেশ দাদার নেই জুড়ি পাণ্ডিত্য,
অথচ তাঁর বোনের দিকেই ভক্তি কেন চিত্তে?
সমস্ত রাত ভেবে-ভেবে এই পেয়েছি উত্তর—
বিদ্যা মানে বলি তারই আর-একটি নাম সুন্দর।
হাউ মাউ খাউ, benevolent সেক্সিজমের গন্ধ পাঁউ! কবিবর তো বললেন মেয়েরা অবলা তো কি হয়েছে সুন্দর বটে! বিদ্যাই সুন্দর।
সুন্দর ব্যাসদেবের মঙ্গলাচরণে দেবী সরস্বতী -
নারায়ণং নমস্কৃত্য নরং চৈব নরোত্তমম্
দেবীং সরস্বতীং ব্যাসং ততো জয়মুদীরয়েৎ
সুন্দর আমাদের হটু বিদ্যালঙ্কার, নিচু জাতের মেয়ে রূপমঞ্জরী থেকে মেয়েদের টোল পণ্ডিত বিদ্যালংকার হবার যাত্রাপথ পাড়ি দিতে পারেন কয়জনা?
সুন্দর আমাদের সাবিত্রীবাই ফুলের বিষ্ঠা মাখা আঁচল। নিচু জাতের মেয়ে হয়ে মেয়েদের স্কুল বানানোর স্পর্ধার খেসারত দিতেন তিনি। উঁচু জাতের মোড়ল পণ্ডিতরা বিষ্ঠা ছুঁড়ে স্কুল ঢোকা বানচাল করতে তৈরি থাকতেন রোজ। সাবিত্রীবাই থামেননি। দমেননি। একটা নোংরা চাদর মুড়ি দিয়ে স্কুলে ঢুকে পড়তেন তিনি। জ্ঞানের সাধনার মার্গ সহজ নয়, তাই তো সে সুন্দর। সুন্দর আমাদের দুষ্ট সরস্বতী, নষ্ট সরস্বতী, ভ্রষ্ট সরস্বতীরা। সুন্দর শীলা ভট্টারিকার রেবা রোধসী। সুন্দর আমাদের বিকট নিতম্বার ইরোটিক শ্লোক।
বিকটনিতম্বা! কি ইন্টারেষ্টিং নাম! ইনি কে বলুন তো?
সব বিদ্যেধরীর নাম একবারে কি আর বলা যায়? ফিরব পরের এপিসোডে দেবী থেকে ডাইনি পর্ব তিন নিয়ে। থাকবেন রূপমঞ্জরী, বিকটনিতম্বা এবং আরও আরও বিদ্যেবতীদের কথা। ততদিন আমাদের বিদ্যেবতীরা পেট ভরে খেতে পাক। তাদের কলম আর জিভের ধার ও ভার বাড়ুক। আমরা মনে রাখি অন্নের সুষম বন্টনেই মঙ্গল।
প্রকৃত রসমঙ্গল।