কথকতার ছলে জীবনের গল্প বলে মেয়েদের দল Mad Balikas
এপস্টিন ফাইলস
সিরিজ: সাময়িকী | পর্ব: EP15 | প্রকাশিত: 08 ফেব্রুয়ারী 2026
সময়কাল: 23 মিনিট 14 সেকেন্ড
কথক: ঋতুপর্ণা ভট্টাচার্য , পারমিতা বন্দ্যোপাধ্যায়

এপস্টিন ফাইলস। সোশ্যাল মিডিয়ায় সেনসেশনাল কনটেন্টের ভিড় একটু ব্যোমকে গিয়েছে এপস্টিন ফাইলস নিয়ে। কার নাম কোথায় কী মর্মে এলো তাই নিয়ে যেমন রাজনৈতিক ভাব সম্প্রসারণ চলছে, অন্যদিকে সেক্স স্ক্যান্ডালের রগরগে বর্ণনায় কেউ শিউরে উঠছেন, কেউ আবার ঠোঁট চেটে বলছেন মেয়েমানুষ পেলে অনেকসময় লঘু গুরু জ্ঞান থাকে বা, তাই বলে কি এতটা করতে আছে? বড় বড় মানুষ সব, বড় বড় ব্যাপার!

তাই কী? এপস্টিন ফাইল শুধু কি বিলিয়নেয়ার বিজনেসম্যানের ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারি হিসেবে আলাদা কেস? একজন বিকৃত লোক, একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা?
এপস্টিন ফাইল ও নারীশরীরের ইকোনোমি নিয়ে আসুন একটু কথা বলি। আগে একটু মূল ঘটনাটা জানা যাক। কে এই এপস্টিন? কী হয়েছিল?

বেশ। নস্টালজিক নাইনটিজ থেকে শুরু করি তাহলে। সবাই অবাক হয়ে দেখল ইনভেস্টমেন্ট এজেন্ট এক কেরানীর হুড়মুড় করে আঙুল ফুলে কলাগাছ। রাতারাতি বিলিয়নেয়ার অর্থলগ্নিকারী জেফ্রি এপস্টিন। কী তার বিসনেস মডেল? কেউ ভালো জানে বা। তবু বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাবান মহলে তার অবাধ যাতায়াত। বিলিয়নিয়ার, রাজনীতিবিদ, রাজপরিবার, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী — সবাই তার সামাজিক বলয়ের অংশ।

কতদিন? নাইনটিজ থেকে টোয়েন্টি ফার্স্ট অবধি। এপস্টিন প্রথম ধরা পড়ে ২০০৬ সালে, ফ্লোরিডায় এপস্টিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে নাবালিকাদের যৌন শোষণের। লোকটা হালকা শাস্তি পায় ২০০৮-এ, ১৩ মাসের জেল।

নাবালিকার যৌন নির্যাতনে হালকা সাজা? নোট করবেন। হ্যাঁ, পরে জানা যায় মিয়ামির বিচারকের সঙ্গে সেটিং করেছিল এপস্টিন, যাকে বলে সুইট হার্ট ডিল। এরপর লোকটা আবার গ্রেপ্তার হয় ২০১৯-এ — আর ঠিক বিচারের আগেই ১০ আগস্ট ২০১৯-এ জেলে মারা যায়।

বেশ। তারপর?

এবারে আসি এপস্টিন ফাইলের প্রসঙ্গে। আদালতের নথি বলছে নব্বইয়ের দশক থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত, এপস্টিন মেয়ে পাচার নেটওয়ার্ক চালিয়ে এসেছে। এই নেটওয়ার্কে শিকার ছিল মূলত নাবালিকা মেয়েরা। গরিব, অর্থকষ্টে থাকা মেয়েদের ২০০ - ৩০০ ডলারের কাজের বাহানায় শিকার করা হত। অনেক সময় ফাঁদে পড়া মেয়েদের দিয়ে নতুন মেয়েদের আনা হতো। তাদের নিয়ে যাওয়া হতো এপস্টিনের একাধিক বাড়ি এবং ব্যক্তিগত দ্বীপে। সেখানে বিলিয়নিয়ার, রাজনীতিবিদ, রাজপরিবার, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সবাই আসত শিশু, কিশোরী নাবালিকাদের শিকার করতে। সেখানে শিশু, কিশোরী, এমনকি গর্ভস্থ সন্তানের ওপরেও নজিরবিহীন অত্যাচার চলেছে, মানব সভ্যতার ইতিহাসে এমন কালো অধ্যায় আগে কখনও দেখা যায় নি।

এতো কোনও একজন বিকৃতকাম লোকের গোপন ব্যক্তিগত জীবন নয়! এটা তো একটা সিস্টেম! এত বছর ধরে এত জায়গায় এভাবে বাচ্চা মেয়েগুলোকে নরপিশাচ গুলো অত্যাচার করল, শোষণ করল, খুলে আম? এপস্টিন এত বছর ধরা পড়ল না কেন?

ভ্যালিড কোশ্চেন। এবার কতগুলো কমেন্ট মনে করা যাক। যাহ! অমুক ছেলে মলেস্ট করেছে? ওকে ফাঁসানো হচ্ছে। জানিস ও কি প্রতিবাদী? স বাবু বউ পেটায়? এ মা! কী যে বলিস! কত বড় কবি উনি? ব বাবু শাড়ি দেখানোর ভঙ্গি দেখে কোন মহিলা মন্ত্রীকে বেহায়া বলেছেন তো কী? উনি কত শিক্ষিত জানিস? বিনি পয়সায় মামলা লড়েন তার বেলা? প বাবু মেয়ে পাচার করতে পারে কখনও? উনি তো সমাজের একজন মাথা!

ছাতার মাথা! এগুলো তো টিপিকাল হেলো এফেক্ট , আমাদের দেশের কালচার। ভালো চাকরি, ডিগ্রি মানেই ধোয়া তুলসিপাতা। রিসপেক্টিবিলিটি পলিটিক্স। এমন অন্ধ ভক্তি তো এখানে হয় জানি। তাই বলে আমেরিকাতেও এক জিনিস?

মজার কথা, এপস্টিন এই সব কটার ক্লাসিক এক্সাম্পল। হেলো এফেক্ট কাজ করেছিল কীভাবে? এপস্টিন ছিল বিলিয়নিয়ারদের বন্ধু, বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় বড় চেক ডোনেশন দেয়, ক্ষমতাবান রাজনীতিবিদদের এক গেলাসের ইয়ার। ফলে মানুষের মাথায় একই ভাবনা: “এত বড় লোক এমন কাজ করবে কেন?” এখানে ইমেজটাই বর্ম।।Respectability Politics পুরো সিস্টেম জুড়ে আছে তার মানে!

এখানে কি হলো? এপস্টিন ১৩ মাস রাজকীয় ব্যবস্থায় 5 ষ্টার জেলে আরাম করে জেল খাটলো। এতে তার মধুচক্র সাম্রাজ্য এতটুকু টসকায়নি। লোকজন বলত “এত নামী লোকজন ওর বাড়িতে যেত — কিছু ভুল হলে জানত না?”

এই লোকজন তো আমাদের মতন এলেবেলে নয়? নোয়াম চমস্কির মতন বুদ্ধিজীবীও এর মধ্যে পড়ছেন!

সমালোচকেরা প্রশ্ন করেছিলেন কেন তিনি এমন একজনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখলেন? চমস্কির জবাব ছিল এপস্টিন তাঁর কাছে ইনভেস্টমেন্ট এজেন্ট ছিলো, আলোচনা আর যোগাযোগের সুযোগ করে দিত এই মাত্র। অপরাধী হিসেবে এপস্টিনকে তিনি দেখেননি। আসলে মোদ্দা কথা হলো, ইনভেস্টমেন্টে ভালো রিটার্ন এলে মেয়েদের শরীর নিলামে তোলার অপরাধ তুচ্ছ হয়ে যায়। এগারো বছর ধরে ভুক্তভোগী মেয়েরা সত্যি বলছিল। সমাজ তাদের বিশ্বাস করেনি। ক্ষমতা এপস্টিনকে বাঁচিয়েছিল, ততদিন, যতদিন না প্রমাণের পাহাড় আর মিডিয়ার চাপ একসাথে বিস্ফোরণ ঘটায়।

২০১৯ সালে লোকটা মরে গেল। এত বছর পর তাই নিয়ে হইচই হচ্ছে কেন?

কারণ এপস্টিনের সব তথ্য আমেরিকার সরকার আটকে রেখেছিলো। এখন সামান্য বেরিয়েছে, তাতেই এত হইচই।

এপস্টিনের ব্যক্তিগত বিমানের ফ্লাইট লগ, ভুক্তভোগীদের মামলার আদালত নথি, আর্থিক লেনদেনের রেকর্ড, আর প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান। সঙ্গে ফোন, ক্যামেরা, সিসিটিভি থেকে অজস্র ছবি আর ভিডিও। আর ইমেল। এই তো হলো এপস্টিন ফাইল।

এই নথিগুলো মানেই সবাই অপরাধী — তা নয়। কিন্তু এগুলো দেখায়— কে কার কতটা কাছাকাছি ছিল, কে নিয়মিত এই পাচার ব্যবস্থার চারপাশে ঘোরাফেরা করছিল। কে বা কারা একজন জেল খাটা নির্যাতনকারীর সঙ্গে কারবার করতে চেয়েছে, কে তার সঙ্গে টাকা ইনভেস্ট করেছে। কোন রাষ্ট্র প্রধান এমন লোকের সঙ্গে কোন রাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, চুক্তি করেছে।

বিল ক্লিন্টন যেমন, এনার নাম বহুবার এপস্টিনের বিমানের ফ্লাইট লগে পাওয়া যায়। এপস্টিনের প্রাইভেট দ্বীপে তিনি সফর করেছেন ঠিক সেই সময়ে, যখন পাচার চলছিল।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তখন কেবলই ব্যবসায়ী। নয়ের দশকে সামাজিকভাবে এপস্টিনের সঙ্গে মেলামেশা করেছেন, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে একসঙ্গে ছবি তুলেছেন। পরে অবশ্য তিনি প্রকাশ্যে দূরত্ব তৈরি করেন।

রাজপরিবারের যোগসূত্রে উঠে আসে — প্রিন্স অ্যান্ড্রুর নাম। একজন ভিক্টিম তাঁকে শপথনামায় অভিযুক্ত করেন। পরে এই নিয়ে আইনি সেটেলমেন্ট হয়।
লেস ওয়েক্সনার যেমন। বিশাল ফ্যাশন সাম্রাজ্যের মালিক। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি এপস্টিনকে বিপুল ইনভেস্টমেন্টের নিয়ন্ত্রণ দিয়ে এসেছিলেন। এই সম্পর্কের মাধ্যমেই এপস্টিনের সম্পদের দ্রুত উত্থান ঘটে। পরে ওয়েক্সনার বলেন তিনি নাকি প্রতারিত হয়েছিলেন। এপস্টিন একটা দুষ্টু লোক। কিন্তু বাস্তব হলো এই সম্পর্ক ছাড়া এপস্টিনের এত বিশাল আর্থিক সাম্রাজ্য সম্ভব হতো না। কিন্তু এ না হয় সামান্য কয়েকজনের হকিকত। কথা হচ্ছে, এই গোটা ব্যবসায় টাকার বিপুল লেনদেন কি হাওয়ায় হাওয়ায় হতো?

মেয়ে মানুষ পাচার চক্র থেকে যে বিপুল কালো টাকা উঠে আসে সেটা বাজারে লগ্নি করিয়ে সাফ সুতরো করার কায়দা হলো মানি লন্ডারিং। তাহলে কী দাঁড়ালো? এপস্টিনের কুকীর্তির কান ধরে টানলে বিলিয়ন ডলারের ইনভেস্টমেন্টের কথা আসে। আর বিলিয়ন ডলারের ইনভেস্টমেন্ট সামলায় কারা

ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যাঙ্ক!

মেয়েদের শরীরের মূল্য দেখুন! বড় বড় ব্যাংক এপস্টিনের এই বিপুল লগ্নি, টাকা সব সামলেছে। এমনকি যৌন অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হবার পরেও এই সিস্টেম দিব্যি চলেছে।

কিন্তু ব্যাংকের তো নিজস্ব অ্যালার্ট সিস্টেম আছে। বড় বড় ব্যাঙ্ক মানি লন্ডারিং নিয়ে সাংঘাতিক সতর্ক থাকে। স্বাভাবিক ভাবেই সবরকম রেড অ্যালার্ট আসার কথা ব্যাঙ্কের সিস্টেমে। যে যে ক্ষেত্রে অ্যালার্ট আসে, যেমন

  • বিশাল অঙ্কের নগদ টাকা তোলা হচ্ছে
  • ডজন ডজন তরুণীর অ্যাকাউন্টে ছোট ছোট অঙ্কের টাকা যাচ্ছে
  • ভুয়ো শেল কোম্পানির মাধ্যমে “কনসাল্টিং ফি” নামে লেনদেন চলছে
  • কোনও পরিষ্কার ব্যবসায়িক আয়ের উৎস নেই

এগুলো তো ক্লাসিক রেড ফ্ল্যাগ। কিন্তু তবু অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়নি। কেন?

কারণ এপস্টিন ছিল ধনী। ক্ষমতাবানদের ঘনিষ্ঠ। যুগ যুগ ধরে এভাবেই নীতি, মানবিকতা সব পাপোশের তলায় রেখে মেয়েদের নিয়ে ব্যবসা হয়ে এসেছে। নজিরবিহীন অত্যাচার চলেছে। নারী শরীরের প্রফিট মার্জিন এতটাই বেশি যে, নীতি মানবিকতা তখন ফাঁকা বুলি হয়ে যায়। পুরো সিস্টেম বহাল তবিয়তে টিকে গেছে তাই। মানি লন্ডারিং ধুয়াধার টিকে গেছে। সঙ্গে? রেপুটেশন লন্ডারিং।

রেপুটেশন লন্ডারিং! ওই যেমন অবৈধ টাকা পরিষ্কার করা হয়, ভুয়ো শেল কোম্পানি আর ব্যবসার মাধ্যমে ? ঠিক তেমনই অপরাধী নিজের বদনাম পরিষ্কার করে — ডোনেশন, সায়েন্স রিসার্চ, শিক্ষা আর সংস্কৃতির ডিটারজেন্ট দিয়ে।

দাগ? ঢুণ্ডতে রহে যাওগে! স্টিফেন হকিং বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের একজন। এপস্টিন নথিতে দেখা যায় তিনি এপস্টিনের স্পনসর করা কনফারেন্সে এসেছেন, একবার এপস্টিনের সেই ভয়ানক মধুচক্র চলত যেখানে সেই ব্যক্তিগত দ্বীপেও গিয়েছিলেন, বিজ্ঞান সম্মেলনের জন্য। এইসব কনফারেন্সে পদার্থবিদ্যা, মহাকাশতত্ত্ব নিয়ে উচ্চস্তরের আলোচনা হত। এতে হকিং ছাড়া বিশ্ব বিখ্যাত বিজ্ঞানীরাও এসেছেন। এমন নয় মধুচক্রের অপরাধের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ পাওয়া গেছে।

এখানে কনফারেন্স যেমন বিরাট বিরাট বিজ্ঞানীর আলোচনা ভাবনা এক জায়গায় জমা হচ্ছে, তেমন এই বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের নাম, স্ট্যাটাস এপস্টিনের কালো কারবারের স্থান কাল পাত্র সব একেবারে ডিটারজেন্ট দিয়ে সাফ করে দিচ্ছে। এপস্টিন সমাজে আরও এলিট স্ট্যাটাস পাচ্ছে, আরও ইনভেস্টমেন্ট পাচ্ছে, আরও কত কত কিশোরী, তরুণী মধুচক্রের ফাঁসে জড়িয়ে পড়ছে।

নারী শরীরের মূল্য কে কিভাবে কতটা প্রফিট মার্জিনে ভাগ করে নেয় আরেকটু তলিয়ে দেখা যাক। এপস্টিনের ঘটনা কোনও বিচ্ছিন্ন কাহিনি নয়। বিশ্বের নানা প্রান্তে যে মেয়ে পাচার চলছে — তার কাঠামোটা প্রায় একই। United Nations Office on Drugs and Crime বলে এই মেয়ে পাচার সাধারণত চারটি ধাপে চলে। কী কী সেই স্টেপ?

প্রথম ধাপ অর্থকষ্টে থাকা পরিবার খুঁজে বার করে সেখান থেকে মেয়েদের তুলে আনা। কখনও বিয়ের ছল করে, কখনও ভুয়ো কাজের টোপ ফেলে। দুর্বল মানুষদের নিয়োগ।

দ্বিতীয় ধাপ — ট্র্যাফিকিং। নির্দিষ্ট পথ ধরে মেয়েদের পাচার।

তৃতীয় ধাপ — মেয়েদের আসল মধুচক্রের ঘাঁটিতে আটকে রাখা। তাদের নিলাম করে বিপুল টাকা তোলা।

আর চতুর্থ এবং শেষ ধাপ — এই কালো নোংরা টাকা রেপুটেশন, ক্ষমতা আর দুর্নীতির ডিটারজেন্ট দিয়ে পরিষ্কার করা।

মেয়েদের শরীরের মূল্য টাকা, ডলার, দিরহাম, রুবেল হয়ে গ্রাম থেকে শহরে অদৃশ্য প্রান্তিক ক্ষুধার্ত মানুষের থেকে ক্ষমতাবান খদ্দেরের কাছে পৌঁছে যায়। এই কাঠামো আমেরিকায় যেমন কাজ করেছে, দক্ষিণ এশিয়াতেও ঠিক তেমনই কাজ করছে।

চলুন এবার তাকাই দক্ষিণ এশিয়ার দিকে। ভারত আর বাংলাদেশ, এই দুই পরিবারতান্ত্রিক দেশে খেতে না পাওয়া পরিবারের দায়িত্ব শেষ অবধি তুলে নেয় কিশোরী, তরুণী মেয়েরা। না, অপহরণ করার দরকার হয় না। শুরু হয় আশ্বাস দিয়ে। শহরে কাজের প্রতিশ্রুতি। ভালো ঘর ভালো বরে বিয়ের প্রলোভন। বিদেশে চাকরির স্বপ্ন।

UNODC বলছে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভিকটিমদের নিয়োগ করা হয় পরিচিত মানুষদের মাধ্যমে। একমুঠো টাকার বিনিময়ে কখনও আত্মীয় কখনও প্রতিবেশী কখনও আগেই ফাঁদে পড়া মেয়েরা হয়ে যান এজেন্ট। ভুলিয়ে ভালিয়ে মেয়েদের নিয়ে আসা হয় বড় বড় শহরে — যেমন, মুম্বই, কলকাতা, ঢাকা।

তারপর অনেককে পাঠানো হয় আরও ধনী গন্তব্যে। বড় বড় প্লেনগুলো একপেট ক্ষিদে নিয়ে বসে থাকা ভারতীয় উপমহাদেশের মেয়েদের শরীর নিয়ে উড়ে যায় মধ্য প্রাচ্যে। প্রান্ত থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রে।

এখন এপস্টিনের দিকে তাকান। সেখানেও এক প্যাটার্ন। ছোট শহর থেকে বড় শহরে অভাবী মেয়েদের নিয়ে আসা হত, ম্যাসাজ দেওয়া, পার্লারের কাজ, ঠিকে কাজের প্রলোভন দেখিয়ে। তারপর? ব্যক্তিগত দ্বীপে চালান হয়ে যেত সেইসব মেয়ে।

ভিন্ন দেশ। ভিন্ন ক্লাস। ক্লায়েন্ট মিলিয়নেয়ার হোক কি বিলিয়নেয়ার। কিন্তু প্যাটার্ন সেই এক।

এতো গেল মেয়েদের শরীর যাওয়ার রাস্তা। এবার তার মূল্য? সে রাস্তা কি এক? নাকি আমেরিকা আর দক্ষিণ এশিয়ায় আলাদা?

মানুষের লোভ মেয়েদের শরীরকে আসলে মস্ত কালো টাকার কারখানা করে রেখেছে। এপস্টিনের জগতে টাকা ধোলাই হচ্ছে বড় বড় ব্যাংক দিয়ে, শেল কোম্পানির মাধ্যমে, “কনসাল্টিং ফি” নামে। দক্ষিণ এশিয়ায় একই টাকা চলে অন্য পথে। সবচেয়ে বড় পথ — হাওয়ালা।

হাওয়ালা। ইয়েস।

বিশ্বাসের উপর দাঁড়ানো গোপন টাকা পাঠানোর নেটওয়ার্ক। ধরা যাক কলকাতায় কেউ নগদ টাকা দিল এক দালালের হাতে। দুবাইয়ে আরেক দালাল সেই টাকা পৌঁছে দিল অন্যজনের কাছে। কোনও কাগজ নেই। কোনও রেকর্ড নেই। এই পদ্ধতি বহুদিন ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে মেয়ে পাচার, চোরাচালান, দুর্নীতিতে। যেখানে ব্যাংক ট্রানজাকশন ঝুঁকিপূর্ণ, সেখানে হাওয়ালা নিরাপদ।

এই হাওয়ালা কেলেঙ্কারি নিয়ে কি জলঘোলা হয়েছিল মনে আছে? আদর্শবাদী সমাজতান্ত্রিক দেশে কেলেঙ্কারির ঝটকা! সে তো এই নাইনটিজ!

তখন সিলিকন ভ্যালির রমরমার সঙ্গে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা গোটা পৃথিবীতে ফুলে ফেঁপে উঠছে, আমাদের নয়ের দশকেই। বাজার লগ্নি খুঁজছে প্রাণপণে। ভারতে এই সময় সামনে আসে জৈন হাওয়ালা কেলেঙ্কারি। গোপন ডায়েরিতে ধরা পড়ে কোটি কোটি টাকা হাওয়ালার মাধ্যমে শীর্ষ রাজনীতিবিদ আর আমলাদের কাছে যাচ্ছে।কোনও ব্যাংক নেই। কোনও হিসাব নেই। বেশিরভাগ মামলা খারিজ হয়ে গিয়েছিল শেষ অবধি, কারণ হাওয়ালায় প্রমাণ থাকে না। কিন্তু এই কেলেঙ্কারি ভারতের অন্ধকার জগতের সমান্তরাল অর্থনীতি সেই প্রথম সামনে নিয়ে আসে। অন্ধকার জগতের টাকা মানেই দুর্নীতি, অপরাধ আর অবৈধ ব্যবসা। পাচার চক্র।

এই একই সময়ে অন্য গোলার্ধে ফুলে ফেঁপে উঠছে এপস্টিন। ভুয়ো ব্যাংক ট্রানজ্যাকশন, আর আছে ভুয়ো সংস্থা। শেল কোম্পানি। এপস্টিন যেমন শেল কোম্পানি বানিয়েছিল, যাতে ব্যবসার মতো দেখতে একটা বিরাট খোলস, ভেতরে বেআইনি কাজের রমরমা।

এই সব ঢপের ডেস্টিনেশন কিন্তু একটাই — নোংরা টাকা পরিষ্কার করা। কোথাও ব্যাঙ্কের সিস্টেমের চোখে ধুলো দিয়ে, কোথাও হাওয়ালায় । ব্যবস্থা বদলায়। শোষণ? বদলায় না। ওয়াল স্ট্রিটের ব্যাংক থেকে গলির ফড়ে দালাল পর্যন্ত — সবাই কোনও না কোনওভাবে এই কালো অর্থনীতির অংশ। মানুষের যন্ত্রণা এখানে ইনভেস্টমেন্ট রিটার্ন নিয়ে আসে।

অথচ এই এত বড় বড় মানুষ, এত শিক্ষিত, এত ক্ষমতাবান মানুষ — কীভাবে এমন শোষণের চারপাশে থেকেও চুপ থাকতে পারে? তাহলে কি মানুষ জন্মগত ভাবেই আসলে শয়তান? ডিগ্রি, শিক্ষা, স্ট্যাটাস কোনও কিছুই আসলে মেয়েদের শরীরকে বাজার ছাড়া আর কিছু ভাবতে শেখায় না?

আমরা এবার একটু মানুষের মনস্তত্ত্বের দিকে তাকাই। কারণ এই একটা প্রশ্ন বারবার ওঠে — মানুষ কি সত্যিই পিশাচ হয়ে জন্মাচ্ছে? আমরা শেষ করব মারিনা আব্রামোভিচকে দিয়ে।

মারিনা আব্রামোভিচ। Rhythm 0 এক্সপেরিমেন্টের জননী।

Rhythm 0। অভূতপূর্ব এক পারফর্মিং আর্ট। শিল্পী মারিনা আব্রামোভিচ ছয় ঘণ্টা একটি গ্যালারিতে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর সামনে একটি টেবিলে রাখা ছিল নানা জিনিস।কিছু নিরীহ জিনিস —একটা পালক, একটা গোলাপ ফুল। আর ছিলো কাঁচি, ছুরি, এমনকি একটি লোড করা রিভলভার। দর্শকদের বলা হয়েছিল —“তোমরা যা খুশি করতে পারো। আমি কোনও বাধা দেব না।” শুরুর দিকে লোকজন ছিল ভদ্র। কেউ ফুল দিল। কেউ আলতো করে শিল্পীকে ছুঁলো। কিন্তু ধীরে ধীরে আচরণ বদলাতে শুরু করল। কেউ গিয়ে তার জামা ছিঁড়ে ফেলল। কেউ আঁচড়ে দিল। কেউ ছুরি দিয়ে মাংস খুবলে নিলো। শেষের দিকে একজন রিভলভারটা তুলে তার গলায় তাক করল। মারিনা স্থানুর মতন দাঁড়িয়ে।

যখন ছয় ঘণ্টা শেষে শিল্পী নড়লেন — অনেকে লজ্জায় পালিয়ে গেল। কিন্তু এই পরীক্ষার কথা এখানে কেন উঠছে?

কারণ এই এক্সপেরিমেন্ট থেকে প্রমাণ হয় ক্ষমতা পেলে, আর পরিণতির ভয় না থাকলে, নিষ্ঠুরতা ধাপে ধাপে বেড়ে যায়। মানুষ হঠাৎ করে পিশাচ হয়ে যায় না। ছোট ছোট সীমা ভাঙতে ভাঙতে শেষে বড় অপরাধ স্বাভাবিক হয়ে যায়। ঠিক এভাবেই জগতের সমস্ত দুর্নীতি, অপরাধের মতন মেয়ে পাচারের ব্যবস্থাও টিকে থাকে।

প্রথমে চুপচাপ জল মাপা। তারপর ছোট কচি করে একটু অপরাধ। ছোট ঘটনা। তারপর সেটা স্বাভাবিক হয়ে যায়। কখন যে মেয়েদের শরীর রক্ত মাংস অস্থি মজ্জা থেকে লোভ আর প্রফিটের আকাশ ছোঁয়া গ্রাফ হয়ে যায় আমরা জানতেও পারিনা।

সবকিছু একসঙ্গে মিলিয়ে দেখি এপস্টিনের নেটওয়ার্কে কী দরকার ছিল? সীমান্ত পারাপার ব্যবস্থা?
ইয়েস

প্রশাসনের নীরবতা?

ইয়েস

আর্থিক বৈধতা?

ইয়েস

ধনী খদ্দের?

ভেরি ইয়েস

রাজনীতিবিদদের সামাজিক সঙ্গ। ব্যাংকের আর্থিক সুবিধা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান। বিলিয়নিয়ারদের অর্থ। এই পুরো ব্যবস্থাকেই গবেষকরা বলেন —এলিট ফেসিলিটেশন। অর্থাৎ — শীর্ষস্তরের মানুষ ও প্রতিষ্ঠানই অপরাধকে টিকিয়ে রাখে।

এপস্টিন মেয়েদের শরীরকে বসিয়ে দিয়েছিল এলিট সমাজ কাঠামোর ভেতরে। যখন এক জায়গায় মিলে যায় রাজনীতি, রাজপরিবার, ধনকুবের, ব্যাংক, বিশ্ববিদ্যালয় — তখন অপরাধ ধরা পড়া কঠিন হয়ে যায়। এই কারণেই তার নেটওয়ার্ক দশকের পর দশক টিকে ছিল।

আমরা দেখেছি আমেরিকায় এপস্টিনের বিলাসবহুল দ্বীপ। আর দক্ষিণ এশিয়ায়, আফ্রিকায় গ্রাম থেকে শহর, শহর থেকে বিদেশ। কোথাও ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা ধোয়া। কোথাও আবার হাওয়ালার মাধ্যমে টাকা চালানো। আমরা দেখেছি প্রতিশ্রুতির ফাঁদ, বিশ্বাসের ফাঁদ, ক্ষমতার আড়াল। সব মিলিয়ে একটা কথাই স্পষ্ট হয় —

মেয়ে পাচার কোনও বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়। এটা একটা সিস্টেম। যা চলে গরিব মেয়েদের শরীর দিয়ে, কিন্তু টিকে থাকে ধনকুবেরদের টাকায়। বাংলার গ্রাম থেকে দুবাইয়ের বিলাসবহুল বার, আমেরিকার প্রাসাদ থেকে ক্যারিবিয়ানের ব্যক্তিগত দ্বীপে — মেয়েদের শরীর বেচে ক্ষমতার অর্থনীতি দিন দিন বেড়ে ওঠে।
পরিণামের ভয়? আছে? ছিলো নাকি কখনও?

এই পর্বের বিশ্লেষণ তৈরি হয়েছে —

United Nations Office on Drugs and Crime, International Labour Organization, এবং এপস্টিন সংক্রান্ত আদালতের নথি ও ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্যের উপর ভিত্তি করে।

আপনার মতামত

এর উত্তরে Some User

এই বিভাগের অন্যান্য পোস্টসমূহ

  • Salt. Blood. Dissent.

    মলঙ্গি বিদ্রোহ, লবণ সত্যাগ্রহ থেকে সশস্ত্র বিপ্লবেও লোনা স্বাদ

    সিরিজ: স্বাধীনতার স্বাদ | পর্ব: EP05 | প্রকাশিত: 17 আগস্ট 2025
    সময়কাল: 28 মিনিট 51 সেকেন্ড
    কথক: ঋতুপর্ণা ভট্টাচার্য , পারমিতা বন্দ্যোপাধ্যায়

    স্বাধীনতার স্বাদ ঠিক কেমন ছিল? রক্ত ঘাম চোখের জলের মতো? নোনতা? রসমঙ্গল সমগ্রে আজ স্বাধীনতার স্বাদ দ্বিতীয় পর্ব। আমাদের এই পর্ব আজ স্বাধীনতার স্বাদ খুঁজতে রসবতী থেকে নামবে মিছিলে, দাঁড়াবে শাসকের উদ্যত লাঠির সামনে, দৌড়বে সত্যাগ্রহ থেকে সশস্ত্র বিপ্লবের মাঝখানে। মধ্যরাতে আসা স্বাধীনতা, উপনিবেশের ভূত তাড়ানো স্বাধীনতা। তার স্বাদের খোঁজ পাওয়া সোজা কথা নয়!

  • মন্বন্তর, আজাদ হিন্দ ফৌজ, নৌ বিদ্রোহ: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে

    মন্বন্তর, আজাদ হিন্দ ফৌজ, নৌ বিদ্রোহ: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে

    সিরিজ: স্বাধীনতার স্বাদ | পর্ব: EP06 | প্রকাশিত: 31 আগস্ট 2025
    সময়কাল: 28 মিনিট 51 সেকেন্ড
    কথক: ঋতুপর্ণা ভট্টাচার্য , পারমিতা বন্দ্যোপাধ্যায়

    স্বাধীনতার স্বাদ কেমন? জানতে আজ আমরা এসেছি যুদ্ধের আঙিনায়। কথায় বলে যুদ্ধ যারা চায় তারা যুদ্ধে যায় না। যুদ্ধে যারা যায়, তারা যুদ্ধ চায় না। সুন জু বলেছিলেন রক্তক্ষয় না করে শত্রুকে দমন করাই সর্বশ্রেষ্ঠ রণনীতি।এদিকে রক্ত না ঝরলে ইতিহাসের মোড়ও যে ঘোরে না? একটা পলাশীর যুদ্ধ ছাড়া কেমন করে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য পাটে বসত?

  • দেবী থেকে ডাইনি কথা - পর্ব তিন

    দেবী থেকে ডাইনি কথা - পর্ব তিন

    সিরিজ: লোক ও লৌকিক | পর্ব: EP14 | প্রকাশিত: 01 ফেব্রুয়ারী 2026
    সময়কাল: 18 মিনিট 24 সেকেন্ড
    কথক: ঋতুপর্ণা ভট্টাচার্য , পারমিতা বন্দ্যোপাধ্যায়

    আমরা আজ বিদ্যেধরীদের গল্প বলব। নবরত্ন সভা থেকে আজকালপরশুর দুনিয়ায় আমরা আজ বিদ্যেধরীদের খবর নেব।

    ইয়েস নবরত্ন সভা। বরাহমিহির, বররুচি, অমরসিংহ, ক্ষপণক, শঙ্কু, বেতালভট্ট, ঘটকর্পর, ধন্বন্তরি - সব চাঁদের হাট। অবশ্যই সকলে পুরুষমানুষ (মহিলারা আবার রাজসভায় কাজ টাজ নিয়ে আসবে কেন?), সেরা পুরুষ এই নয় রত্ন। আর সেরার সেরা পুরুষ? যিনি প্রেমের ভাষ্য তৈরি করবেন কলমের আঁচড়ে?

    কালিদাস! এই অবধি পড়ে আপনারা শুধোবেন বিদ্যেধরীর কথায় কালিদাস? তাহলে কি সেই সরস্বতীর গল্পটা?

  • দেবী থেকে ডাইনি কথা - পর্ব দুই

    দেবী থেকে ডাইনি কথা - পর্ব দুই

    সিরিজ: লোক ও লৌকিক | পর্ব: EP13 | প্রকাশিত: 25 জানুয়ারী 2026
    সময়কাল: 14 মিনিট 15 সেকেন্ড
    কথক: ঋতুপর্ণা ভট্টাচার্য , পারমিতা বন্দ্যোপাধ্যায়

    ডাকিনীবিদ্যার কথায় বামপন্থার একটা কথা উঠেছিল, মনে আছে? আচ্ছা এই মারি কি সেই মারি হয়ে ছুটে আসার আগে আর এক ধাপ এগোই? উঁকি মারা যাক বজ্রযানী গুহ্যসমাজতন্ত্রের দুনিয়ায়। এ এক অভূতপূর্ব মহাযোগ শ্রেণীর তন্ত্র, যে তন্ত্র বামাচার অনুশীলন যেমন মদ, যৌনাচার ও শ্নশান সাধনার মতো নিষিদ্ধ ব্যবহারের মাধ্যমে ক্রোধী দেবতাকে আহবান করতে শেখায়! বামাচার, অর্থাৎ কিনা বাম হাতের পথ!

    কাজেই লগুড় হাতে এগিয়ে আসার দরকার নেই, বুঝলেন? এ বামপন্থা সে বামপন্থা নয়! এ হল যা কিছু প্রচলিত পদ্ধতির বিপরীতে। প্রচলিত পদ্ধতি বলতে দক্ষিণাচারী পন্থা। তাহলে বামাচারের ভাগে পড়ল, কী?

    কুখ্যাত পঞ্চ ম-কার। মদ্য (মদ), মাংস, মৎস্য (মাছ), মুদ্রা (শস্যকণা) এবং মৈথুন। কী? জমে যাচ্ছে তো বিষয়টা?

  • বারোয়ারি দুর্গাপুজো; বাঙালির দ্রোহের ইতিহাস

    বারোয়ারি দুর্গাপুজো; বাঙালির দ্রোহের ইতিহাস

    সিরিজ: লোক ও লৌকিক | পর্ব: EP07 | প্রকাশিত: 14 সেপ্টেম্বর 2025
    সময়কাল: 32 মিনিট 43 সেকেন্ড
    কথক: ঋতুপর্ণা ভট্টাচার্য , পারমিতা বন্দ্যোপাধ্যায় , চৈতালী বকসী

    মহালয়ার ভোরের আকাশে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠ কি এখনও জাগিয়ে রাখে বাঙালির শিকড়ের বারোয়ারি উত্তরাধিকার? পলাশীর যুদ্ধ থেকে সিমলা ব্যায়াম সমিতির দ্রোহী দুর্গাপুজো, ইছাই ঘোষের শ্যামরূপা থেকে গুপ্তিপাড়ার প্রথম সার্বজনীন পুজো—সবকিছুর ভেতরেই লুকিয়ে আছে মাতৃপূজক বাঙালির অবাধ্যতার ইতিহাস।

  • খিচুড়ি, ইলিশ ও গল্প

    খিচুড়ি ইলিশ, মঙ্গলকাব্য থেকে পোস্ট মর্ডানিসম

    সিরিজ: ⁠রসবতীর রসকরা | পর্ব: EP02 | প্রকাশিত: 06 জুলাই 2025
    সময়কাল: 20 মিনিট 30 সেকেন্ড
    কথক: ঋতুপর্ণা ভট্টাচার্য , পারমিতা বন্দ্যোপাধ্যায়

    রবিহারা দিনগুলোতে গা ম্যাজম্যাজ নাক ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ? এই ওয়েদারে গরম গরম ধোঁয়া ওঠা এক থালা খিচুড়ির আগ্নেয় পাহাড়, তার জ্বালামুখ থেকে গড়িয়ে পড়ছে টলটলে ঘিয়ের স্রোত। জিভ, পেট, মন, শরীর উষ্ণ রাখতে আজ পাতে পড়বে কী? কেন? খিচুড়ি? শীতের কনকনে রাতে বর্ষার ঝমঝমে দুপুরে ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ি খেলে শরীর ওম পায়। হাই ফাইবার হাই ক্যালোরি এইসব খাবার হজম করতে করতে একটু মঙ্গলকাব্যে শুনুন।

  • Podcast Banner - EP03 - রুটি থেকে ভাত

    সিপাহী বিদ্রোহ থেকে সেলুলার জেলের হেঁশেল

    সিরিজ: স্বাধীনতার স্বাদ | পর্ব: EP04 | প্রকাশিত: 03 আগস্ট 2025
    সময়কাল: 29 মিনিট 18 সেকেন্ড
    কথক: ঋতুপর্ণা ভট্টাচার্য , পারমিতা বন্দ্যোপাধ্যায়

    পনেরই আগস্ট, ১৯৪৭, মধ্যরাত্রি। পৃথিবীর মানচিত্রে উদয় হল এক স্বাধীন দেশ, ভারতবর্ষ। স্বাধীন দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বক্তৃতাটি দিয়ে জওহরলাল নেহরু উপস্থিত সবাইকে মতিচুরের লাড্ডু বিতরণ করে খাইয়েছিলেন। স্বাধীনতার প্রথম স্বাদ- মিঠে না হয়ে যায় না। তিনি কি জয় হিন্দ সন্দেশের স্বাদ জানতেন? বা জয় হিন্দ বরফি? নিদেন পক্ষে নেহরু সন্দেশ?

  • মেয়েরা আবার ক্রিকেট খেলে নাকি?

    মেয়েরা আবার ক্রিকেট খেলে নাকি?

    সিরিজ: সাময়িকী | পর্ব: EP11 | প্রকাশিত: 09 নভেম্বর 2025
    সময়কাল: 23 মিনিট 44 সেকেন্ড
    কথক: ঋতুপর্ণা ভট্টাচার্য , পারমিতা বন্দ্যোপাধ্যায়

    “মেয়েরা আবার ক্রিকেট খেলে নাকি?”

    দাঁড়ান দাঁড়ান, এটা শুধু একজনের মন্তব্য নয়। রেচেল হেহোর গল্পটা বলি।

    ১৯৪৭ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষের পরে ইংল্যান্ডে তখন ঘর গোছানোর পালা চলছে। এমন সময় এক বিকেলবেলা একদল চ্যাংড়া ছেলে রাস্তায় ক্রিকেট খেলছে দেখে তাদের পুলিশ গিয়ে ধরল। একুশে আইনের দেশ ইংল্যান্ডে তার একশো বছর আগে থেকে কড়া নিয়ম ছিলো পাবলিক প্লেসে খেলাধুলা করা যাবে না। তো পুলিশ গিয়ে ছেলেপুলেদের ধরল। একটা মেয়েও ছিলো খেলার দলের মধ্যে। পুলিশ তাকে বলল,

    “ওহে খুকি, বাড়ি যাও দেখি? বাকিরা আমার সঙ্গে এসো। কুইক!”

    ছেলেদের দল বোধ হয় বলার চেষ্টা করেছিল খুকিও একই অপরাধে অপরাধী, কিন্তু পুলিশ সেসব কথা কানেই তুলল না। তাদের একটাই কথা, মেয়েরা আবার ক্রিকেট খেলে নাকি? এসব চ্যাংড়াদের হুজ্জুতি বই তো নয়?

    খুকি সেদিন বড় অপমানিত হয়ে বাড়ি ফিরেছিল। পুলিশের লম্বা লম্বা বুলির জবাব সে না হয় ব্যাটেই দিয়ে দিত আরও লম্বা লম্বা ছক্কা হাঁকিয়ে, ব্যাট বল কেড়ে না নিলে দেখিয়ে দিতই।