ধরুন আপনি একজন আমেরিকান বিনিয়োগকারী। ডলারে মুখ মোছেন। ভারতে ডলার দিয়ে শেয়ার কিনেছেন বছরখানেক আগে।
সাধু সাবধান! এক বছর আগে ১ ডলার ছিল ₹৮৫।
আপনি ১০০ ডলার দিয়ে কিনলেন ₹৮,৫০০-র শেয়ার।
আজ টাকার দর হয়েছে ₹৯২.৯ প্রতি ডলার। সেই শেয়ার এখনো ধরুন ₹৮,৫০০ রয়েছে। টাকায় কমেও নি, বাড়েও নি। কিন্তু ডলারে মূল্য কমে হয়েছে মাত্র $৯০.৫।
মানে শেয়ারের দাম টাকায় না কমলেও, ডলারে আপনি ইতিমধ্যে ১০% লোকসান করেছেন।
কাজেই ডলার পিছু টাকা ₹৯৫-১০০-এ গেলে বিদেশি বিনিয়োগ হুড়মুড় করে বিক্রি হয়ে যাবে। বাজারে ধস নামবে। সেও আমরা দেখেছি। আরবিআই মার্চ মাসেই $১৫ বিলিয়ন বিক্রি করেছে রুপি সামলাতে।
বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী যদি সংকট অব্যাহত থাকে, ২০২৬-২৭-এ আমদানি বিল হতে পারে $৯১১ বিলিয়ন।
আমদানি আট আনার, খরচা রুপাইয়া। দেশ বাইরে যা পাঠাবে তার চেয়ে বাইরে থেকে মাল আনতে $৪০ বিলিয়ন বেশি খরচ করবে।
ঘাটতি মেটাতে? সেই লক্ষ্মীর ভাঁড়, যারে কয় ফরেক্স রিজার্ভ, ভাঙতে হয়।
চক্রটা দেখতে পাচ্ছেন?
তেলের দাম বাড়ল → ভারতকে বেশি ডলার দিয়ে তেল কিনতে হল → ডলার চাহিদা বাড়ল → রুপি দুর্বল হল → দুর্বল রুপিতে একই তেল কিনতে আরও বেশি খরচ → আবার ডলার চাহিদা বাড়ল।
কিন্তু কথা হচ্ছিল, চরকার বদলে এ কোন কুচক্রে আমরা ঢুকে পড়লাম? কেন?
উত্তর পাবেন একটি সংখ্যায়: ৫০%
ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় অর্ধেক হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসত। উপসাগরীয় দেশগুলি — ইরাক, সৌদি আরব, কুয়েত, এমিরেটস ভারতের মোট আমদানির অর্ধেকের বেশি সরবরাহ করত। এই দেশগুলির তেল আরব সাগরে পৌঁছাতে অবশ্যই হরমুজ পার হতে হয়।
এবারে ক্রোনোলজি বুঝে নেওয়া যাক?
ভারত ইরান থেকে তেল কিনছে ব্রিটিশ রাজ আমল থেকে।
স্বাধীনতার পর থেকেই ভারতের পরিশোধনাগারগুলি মূলত ইরানি ও উপসাগরীয় তেলের জন্য তৈরি হয়েছিল। ভৌগোলিক নৈকট্য, একই রাসায়নিক গঠন, দীর্ঘ সম্পর্ক — সব মিলিয়ে ইরান ছিল ভারতের “স্বাভাবিক” সরবরাহকারী। ইরান যে শর্তে তেল দিত সেটা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশ দেয়নি।
ইরান নিজেই জাহাজ পাঠাত — ভারতকে ট্যাংকার ভাড়া করতে হতো না।
ষাট দিনের ধারে তেল আসত। কিস্তি চোকানোর আগেই তেল ভারতে পৌঁছে যেত।
ইরান নিজে বীমা করত
এই তিনটি সুবিধা মিলিয়ে ইরানি তেলের কার্যকর দাম অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম পড়ত
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির কারণে আমেরিকা ও ইউরোপ নিষেধাজ্ঞা বসাল। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার কালেও ভারত একটা দারুণ বিকল্প বের করেছিল:
ভারতীয় পরিশোধনকারীরা তেলের ৪৫% মূল্য ভারতে ইরানি ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে রুপিতে জমা দিত।
ইরান সেই রুপি দিয়ে ভারতীয় পণ্য কিনত — চাল, চিনি, চা, ওষুধ।
বাকি ৫৫% নিষেধাজ্ঞা উঠলে পরিশোধ করা হবে বলে মুলতুবি থাকত।
এটা কার্যত এমন একটা ব্যবস্থা যেখানে ইরান ভারতের বাঁধা ধরা ক্রেতায় পরিণত হয় — বার্ষিক তেইশ হাজার কোটির ভারতীয় পণ্য রপ্তানি নিশ্চিত।
২০১৫ সালে পারমাণবিক চুক্তি হলো, ইরানের নিষেধাজ্ঞা উঠল। ভারতের আমদানি বিস্ফোরণের মতো বাড়ল। প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনার সূত্রপাত ২০১৬। দেশ লাভ করলে দেশের মানুষ উপকৃত হবেন, এটাই গণতন্ত্রের প্রাচীন প্রবাদ।
ট্রাম্প ২০১৮ সালে নভেম্বরে ইরানের ওপরে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেন। ভারত সহ আট দেশকে ছয় মাসের ছাড় দেওয়া হলো। মে ২০১৯ সালে সেই ছাড়ের মেয়াদ শেষ হলো।
ইরান এক বছরে বিশ্বের নবম বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক থেকে ৭১তম-এ নামল।
এবারে রাশিয়া। ফেব্রুয়ারি ২০২২-এ ইউক্রেন আক্রমণের পর ইউরোপ রাশিয়ার তেল ত্যাগ করল। রাশিয়া বাজার হারাতে বসল। ভারত সেই সুযোগে রাশিয়া থেকে আমদানি শুরু করল, ভালো ছাড়ও পেল। দুই বছরে ভারতের মোট সাশ্রয় দাঁড়ায়: প্রায় এক লক্ষ কোটি টাকা।
এক লক্ষ কোটি টাকা!
এই সংখ্যাটা মনে রাখবেন। এবার আসি আমেরিকার খবরদারি আর বাণিজ্য চুক্তিতে। এটাই প্রথম ধাপ। ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা ভারতকে রাশিয়ার তেল কমাতে বাধ্য করল — মানে উপসাগরের দিকে আরো ঝুঁকতে হলো, হরমুজ নির্ভরতা বাড়ল।
দ্বিতীয় ধাপ: এখন যেখানে আছি। হরমুজ খোলা না বন্ধ কেউ জানে না। ইরান বলেছে হরমুজ “আমেরিকা ও তার মিত্র” ছাড়া সবার জন্য খোলা। চীন, রাশিয়া, ভারত, ইরাক, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড — এদের জাহাজ অনুমতি পেয়েছে। IRGC একটি “টোল বুথ” তৈরি করেছে — সেখান দিয়ে যেতে হলে ডকুমেন্টেশন জমা দিতে হবে, এবং কিছু ক্ষেত্রে ফেলো কড়ি মাখো তেল। ইরান নিজেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কাকে যেতে দেবে। ভারতে উপসাগরের সরবরাহ অনিশ্চিত, গতি অতি মন্থর।
তৃতীয় ধাপ: রাশিয়া হয়ে দাঁড়াল স্বাভাবিক বিকল্প। কিন্তু সেখানেও ট্রাম্পের বারণ। তিরিশ দিনের রিনিউয়াল না হলে খালি পেটে ধুরন্ধর দেখতে হবে।
চতুর্থ ধাপ: আমেরিকান ও ভেনেজুয়েলান তেল অন্য পথে আসে, কিন্তু তা মোট সরবরাহের ৮-১২% মাত্র। উপসাগরের ৫০% ঘাটতি পূরণে যথেষ্ট নয়।
এবারে আসি পরিশোধনাগারের সমস্যায় যা কেউ বলছে না।
ভারতীয় পরিশোধনাগার দশকের পর দশক ধরে উপসাগরীয় 'মিডিয়াম সাওয়ার' ক্রুড অয়েল — আরব মিডিয়াম, বসরা লাইট, কুয়েত এক্সপোর্ট — প্রক্রিয়া করার জন্য তৈরি।
আমেরিকান তেল অতিরিক্ত হালকা। ভেনেজুয়েলান তেল বেশি ভারী ও সালফারযুক্ত — বিশেষ কোকিং ইউনিট দরকার যা বেশিরভাগ সরকারি পরিশোধনাগারে নেই।
রাশিয়ান তেল উপসাগরীয় ক্রুডের সবচেয়ে কাছের বিকল্প — ঠিক এই কারণেই রাশিয়া ভারতের জরুরি বিকল্প হয়েছিল। এবং ঠিক এই কারণেই আমেরিকান নিষেধাজ্ঞা সেদিকেই লক্ষ্য করেছে।
আমেরিকার বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হল ২ ফেব্রুয়ারি। উপসাগরীয় যুদ্ধ শুরু ২৮ ফেব্রুয়ারি। মাত্র ২৬ দিনের ব্যবধান।
কাকতালীয়? কে জানে?
অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন ১৩ মার্চ ইকোনমিক স্টেবিলাইজেশন ফান্ড ঘোষণা করলেন। মোট প্রস্তাবিত তহবিল ₹১ লক্ষ কোটি।
রাশিয়ার তেল থেকে দুই বছরে ভারতের মোট সাশ্রয় ছিল এক লক্ষ কোটি টাকা। মনে আছে? লাভের কড়ি শুধু বাঘে খায় না, ট্রাম্পেও খায়।
এবারে আরেকটা দেজা ভূ ফিলিং দিই। এই ফান্ড কে অডিট করবে তা নির্দিষ্ট করা হয়নি। পিএম কেয়ারের ক্ষেত্রে একই প্রশ্নের উত্তর আসেনি।
বেশি প্রশ্ন করলে কারা আবার চটে যায়! তাহলে এই ফান্ড দিয়ে যা হোক করে পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ তৈরি হোক?
এবারে আসি একটা ছোট্ট রেফারেন্সে। কর্নাটকের পাদুরে ভারতের প্রথম বেসরকারি স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ তৈরির বরাত পেয়েছে কে?
মেঘা ইঞ্জিনিয়ারিং ইনফ্রাস্ট্রাকচারস লিমিটেড। নির্বাচনী বন্ডের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রেতা — ₹৯৬৬ কোটি। এর মধ্যে ₹৫৮৬ কোটি BJP-কে দেওয়া হয়েছে।
খুবই দয়ালু কোম্পানি।
অথচ CBI ইস্পাত কারখানা প্রকল্পে ₹১৭৪ কোটির ঘুষের অভিযোগে এই সোনার টুকরো কোম্পানির বিরুদ্ধে FIR দায়ের করেছে। ওদিকে থানে-বোরিভালি টানেল বানানোর সময় এই কোম্পানি ইউরো এক্সিম ব্যাংকের গ্যারান্টি জমা দিয়েছিল, যা কিনা একটি ক্যারিবিয়ান ট্যাক্স হেভেনের ব্যাংক, আরবিআই স্বীকৃত নয়।
এবারে পেট্রল রিজার্ভের চুক্তির মেয়াদ কী? ৫ বছর নির্মাণ এবং ৬০ বছর পরিচালনা। সরকার বিনামূল্যে ২১৪ একর জমি হস্তান্তর করবে।
এই চুক্তি দেওয়া হয়েছিল সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ — উপসাগরীয় যুদ্ধের পাঁচ মাস আগে। আন্তর্জাতিক কোম্পানি যেমন সৌদি আরামকো, গোল্ডম্যান স্যাক্স, ভিটল এদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল — কেউ অংশগ্রহণ করেনি।
তাহলে কী দাঁড়াল?
₹১ লক্ষ কোটির তহবিল তৈরি হয়েছে — অডিটর অনির্দিষ্ট, মোতায়েন মানদণ্ড অনির্দিষ্ট। এর টাকা ইনফ্রাস্ট্রাকচারে যাবে, তেলের মজুত পূরণে যাবে। যে কোম্পানি বেসরকারী ভান্ডার নির্মাণ ও পরিচালনা করবে সে BJP-র সর্বোচ্চ দাতা, CBI তদন্তাধীন, জাল ব্যাংক গ্যারান্টির অভিযোগে অভিযুক্ত।
আমেরিকার সঙ্গে মিল আছে কিন্তু। ট্রাম্পের ছেলে ড্রোন কোম্পানিতে বিনিয়োগ করছে যখন তাদের বাবা সেই ড্রোন ব্যবহার করে যুদ্ধ করছেন। ট্রাম্প ইরানি বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা বিরতির ঘোষণা করার ঠিক ১৬ মিনিট আগে তেল বাজারে ₹৫৪,৪৬২ কোটির অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটে — কোনো প্রকাশ্য খবর ছাড়াই।
কাকতালীয়?
আসলে কাকতাল একটা রাজনীতির টার্ম। দায় এড়ানোর অজুহাত। অর্থনীতিতে কাকতালীয় বলে কিছু হয় না!
যুদ্ধের বিল তাহলে কোথায় গিয়ে পৌঁছাল?
References
- রুপির দর ও FPI
- RBI's FX clampdown: Temporary relief for Rupee, not a trend reversal | Anil Kumar Bhansali | Business Standard | 2026-03-30 | 1154 hrs IST
- Forex reserve পতন
- March sees $30 billion drop in India's foreign exchange reserves | Anupreksha Jain | Business Standard | 2026-03-27 | 1106 hrs IST
- ভারতের হরমুজ নির্ভরতা
- Why India looks especially vulnerable as conflict rages in Middle East | Priyanka Salve | CNBC | 2026-03-02 | 0537 hrs EST
- IRGC Tollbooth
- IRGC Opens Tolled Passage for Merchant Ships in Strait of Hormuz, Transit Continues to Trickle Through | Heather Mongilio | USNI News | 2026-03-27 | 1718 hrs
- ইরান-ভারত তেল ও রুপি পেমেন্ট
- Oil Trade Between Iran and India Plummets | John Prentice Caves III | The Iran Primer | United States Institute of Peace | 2019-06-12
- India to continue Iran oil imports post US sanctions, to pay in rupees | PTI New Delhi | 2018-10-06 | 0153 hrs IST
- রাশিয়ান তেলে সাশ্রয়
- Indian refiners likely saved at least $10 bn due to discounted Russian oil | Nisha Anand | Business Standard | 2024-07-11 | 1612 hrs IST
- India Saved $25 Billion by Importing Russian Crude Oil: Ministry Data | Hindustan Times | 2024-05-13
- Economic Stabilization Fund
- Economic Stabilization Fund to help India tackle unexpected crises: Sitharaman | PTI | 2026-03-13 | 1925 hrs IST
- ₹1 trillion stabilisation fund to give fiscal headroom: FM Sitharaman | Ruchika Chitravanshi | Business Standard | 2026-03-13 | 1134 hrs IST
- মেঘা Engineering — পাদুর চুক্তি
- MEIL secures bid for India's first private strategic petroleum reserve | Rishika Agarwal | Business Standard | 2025-09-16 | 1002 hrs IST
- মেঘা Engineering — নির্বাচনী বন্ড
- Electoral Bonds: At Rs 584 crore, Megha Engineering top donor to BJP | PTI | 2024-03-28 | 2135 hrs IST
- Electoral Bonds Data: At Rs 669 Crore, Megha Engineering Tops BJP's Donor List | Meenakshy Sasikumar | The Quint | 2024-03-22 | 1227 hrs IST
- Behind the curtain: unravelling corruption in the electoral bonds scheme | Devendra Poola & Vinitha Anna John | Nature: Humanities and Social Sciences Communications | 12, 1949 (2025) || Citation: Poola, D., Anna John, V. Behind the curtain: unravelling corruption in the electoral bonds scheme. Humanit Soc Sci Commun 12, 1949 (2025). https://doi.org/10.1057/s41599-025-06201-z
- Euro Exim Bank ও থানে-বোরিভালি
- Despite RBI Rules, Govt Agencies and States Are Accepting Guarantees From a Bank in the Caribbean | Meetu Jain | The Wire | 2024-09-11
- Plea In Bombay High Court Seeks Probe Into Alleged ₹16.6 Crore Fraudulent Bank Guarantees In Thane-Borivali Twin Tunnel Project | Sanjana Dadmi | LiveLaw | 2025-02-12 | 1630 hrs IST
- Bombay High Court junks PIL against bank guarantees in ₹16k crore Borivali-Thane tunnel project | Sahyaja MS | Bar and Bench | 2025-03-18 | 1123 hrs IST