আমরা আজ বিদ্যেধরীদের গল্প বলব। নবরত্ন সভা থেকে আজকালপরশুর দুনিয়ায় আমরা আজ বিদ্যেধরীদের খবর নেব।
ইয়েস নবরত্ন সভা। বরাহমিহির, বররুচি, অমরসিংহ, ক্ষপণক, শঙ্কু, বেতালভট্ট, ঘটকর্পর, ধন্বন্তরি - সব চাঁদের হাট। অবশ্যই সকলে পুরুষমানুষ (মহিলারা আবার রাজসভায় কাজ টাজ নিয়ে আসবে কেন?), সেরা পুরুষ এই নয় রত্ন। আর সেরার সেরা পুরুষ? যিনি প্রেমের ভাষ্য তৈরি করবেন কলমের আঁচড়ে?
কালিদাস! এই অবধি পড়ে আপনারা শুধোবেন বিদ্যেধরীর কথায় কালিদাস? তাহলে কি সেই সরস্বতীর গল্পটা?
আরে এই গল্পটা সব্বাই জানে। কালিদাস তো প্রথম জীবনে লেখাপড়া জানতেন না। পুরো হিন্দি সিরিয়ালের মতন ভুল বোঝাবুঝিতে তাঁর সঙ্গে এক বিদূষী রাজকন্যার বিয়ে হয়ে যায়। কিন্তু হ্যাপিলি এভার আফটার হবার আগেই একটা উটকো ঘটনা ঘটে গেল। বসন্ত আলাপ হয়ে গেল বিলাপ, থ্যাঙ্কস টু উটকো ঘটনার ভিলেন ওই উটটাকে।
ইয়েস, উট। ফুলশয্যার রাত্তিরে এমনি ডেকে উঠল, নতুন বর ঘাবড়ে গিয়ে বৌকে বলল “উষ্ট, ডাকছে উষ্ট”। বিদূষী কন্যা প্রথমে বর্ণ বিপর্যয় ভেবে জিজ্ঞেস করলেন, “কী বলছো প্রাণেশ্বর?”ঘাড় চুলকে প্রাণেশ্বর বললেন, “উট্র, উট্র ডাকছে”।
ব্যাস। রোমান্সের অকালমৃত্যু ঘটে গেল। রাজকন্যা বুঝে গেলেন তাঁর সঙ্গে একটি গেঁয়ো ক্লাসলেস নির্বোধ লোকের বিয়ে হয়েছে। রমেডি থেকে সিধে ট্র্যাজেডি! এই ঘটনার পরেই কালিদাস মনের দুঃখে বনে গেলেন। সেখানে দেবী সরস্বতীর বর পেয়ে কুমারসম্ভবের কবি হয়ে গেলেন। ক্লাসলেস থেকে ফার্স্ট ক্লাস ব্যাপার, তাই না?
এনকোর এনকোর, ঠিক যেন সস্তার হিন্দি সিনেমা। এবার একটা কবিতা শোনাই। শ্লোক আর কি!
কালে মাষং শস্যে মাসং বদতি শকাসং যশ্চ সকাশং
উষ্ট্রে লুম্পতি ষং বা রং বা, তস্মৈ দত্তা বিকট নিতম্বা
এর অর্থ?
অর্থম অনর্থম! কবি বিকট নিতম্বা বলছেন এমন বর তিনি পেয়েছেন, তার শ এর দোষ। মাসে ষ, আর মাষকলাইয়ে স লাগায়। উষ্ট্রকে কখনও উষ্ট কখনও উট্র বলে। চেনা গল্প না?
এবার আপনি হাঁ হাঁ করে বলবেন অ্যাই, এ তো কালিদাসের গল্প! নাহয় এমন শ্লোক কালিদাস লেখেননি, তাই বলে বিখ্যাত পুরুষমানুষের গল্প তো আর মিথ্যে হতে পারে না? বেশ, এই মইলা কবি বিকট ইসে, ওনার গপ্পোটা কী শুনি?
নাহ! শৃঙ্গার রসের বিখ্যাত কবি বিকটনিতম্বার গল্প কোথাও নেই। আমরা এ গল্প কালিদাসের বলেই তো জানি।
এনার সম্পর্কে কী জানা যায়?
কিছুই জানা যায় না! তিনি তো আর কুমারসম্ভবের কবি নন! রঘুবংশম লেখেননি। রাজার ধর্মীয় প্রোপাগান্ডার মধ্যে কাজে না লাগলে ইতিহাস কেন মনে রাখতে যাবে তাঁকে?
দূর বাবা, এইসব থিওরি লিখতে লিখতে বড্ড যাকে বলে পুরুষ বিদ্বেষ করে ফেলছি। আরে বাবা কালিদাসের এক্সপ্রেশন যাকে বলে গ্লোরিয়াস। সত্যিই তো, কেই বা লিখেছেন,
যঃ কৌমারহরঃ স এব হি বরস্তা এব চৈত্রক্ষপা —
স্তে চোন্নীলিতমালতীসুরভয়ঃ প্রৌঢ়াঃ কদম্বনিলাঃ।
সা চৈবাস্মি তথাপি তত্র সুরতব্যাপারলীলাবিধৌঃ
রেবারোধসি বেতসীতরুতলে চেতঃ সমুৎকন্ঠতে।
আহা আহা। কি অপূর্ব, এর মানে? বুঝতেই পারছেন খুব ইয়ে কিছুই বলছেন। সুশীলকুমার দে অনুবাদ করেছেন
কৌমার মোর হরেছিলো যেই, সেই বর সেই চৈত্ররাতি;
তেমনি ফুল্ল মালতী গন্ধ, কদম্ব – বায়ু বহিছে মাতি;
আমিও তো সেই! — তবু সেদিনের সে — সুরতলীলা কিসের তরে
রেবাতটে সেই বেতসীর মূলে আজিও চিত্ত আকুল করে।
বাপ রে কি মডার্ন ব্রেভ ব্যাপার বলুন? কালিদাস যাকে বলে ফাটাফাটি।
হ্যাঁ খুবই ফাটাফাটি। কারণ শ্লোকটি কালিদাস লেখেননি। লিখেছেন শীলা ভট্টারিকা। ইনি মহিলা কবি, শৃঙ্গার রসের কবি এবং কবি কালিদাসের সময়ের কবি, যাঁকে আমরা সকলে ভুলে মেরেছি।
ইরোটিকা, মানে শৃঙ্গার রস নিয়ে লিখেছেন, এইখানে জোর দেবেন। কালিদাসের যুগ বলে লিখতে পেরেছেন, তখন “মেয়েমানুষের বুকের বোতাম কবিতাতেও খোলা যাবে না” গোছের ভিক্টোরিয়ান মোড়লগিরি এসে পৌঁছতে হাজার হাজার বছর দেরি। তা লিখলেন ভালো কথা, কিন্তু এনার সম্পর্কেও কিছুই জানা যায় না। শীলা ভট্টারিকার কবিতা রয়ে গিয়েছে, কবির পরিচয় মুছে গিয়েছে। বা বলা ভালো, সিস্টেমেটিক্যালি মুছে দেওয়া হয়েছে। একেবারে টিপিক্যাল বিদ্যেধরী ট্রিটমেন্ট!
এবার বসন্তের খপ্পর থেকে একটু বেরোই। টাইম লিপ নিয়ে চলুন যাই পলাশীর যুদ্ধের পর। এই যে, দুই বিদ্যেধরী হটি বিদ্যালঙ্কার আর হটু বিদ্যালঙ্কার। দুজনেই আশ্চর্য অন্ধকার সময়ে মেয়েদের টোল খুলেছেন। অথচ কত কম জানি আমরা এই দুইজনকে নিয়ে।
অনুমান করা হয়, অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে তৎকালীন বাংলার রাঢ় অঞ্চলে বর্ধমান জেলার সোঁঞাই গ্রামে কুলীন ব্রাহ্মণ পরিবারে হটী বিদ্যালঙ্কারের জন্ম হয়। তাঁর বা তাঁর বাবা মায়ের প্রকৃত নাম সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। খুব অল্প বয়সে তিনি বিধবা হন। এখন কুলীন মেয়েদের অকাল বৈধব্য তো আশ্চর্য কিছু নয়। তবে হটী শাস্ত্রশিক্ষা করে কবে যে বিদ্যালঙ্কার হলেন তার খোঁজ পাওয়া দুষ্কর।
সেকালের বিদ্যাপীঠ সোঁঞাই গ্রামে তিনি মেয়েদের টোল খুলেছিলেন। তারপর ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের আগমন। সোঁঞাই গ্রামের প্রবাদপ্রতিম গুরুকুল সিস্টেম এবং শাস্ত্রচর্চার ধারা গেল শুকিয়ে। হটী বিদ্যালঙ্কার তখন টোল নিয়ে আসেন বেনারসে। আমৃত্যু তিনি সেখানেই মেয়েদের পড়িয়েছেন। ১৮০৬-০৭ সালে উইলিয়াম ওয়ার্ড ‘হিন্দু’ বইটি যখন রচনা করেন তখন দিকপাল পণ্ডিত জগন্নাথ তর্কপঞ্চাননের সঙ্গে এক ব্র্যাকেটে থাকছেন হটী বিদ্যালঙ্কার। ১৮১৭ সালে স্থাপিত স্কুল বুক সোসাইটি প্রকাশিত ‘স্ত্রীশিক্ষা বিষয়ক’ বইয়ে হটীর সাফল্য ও সম্মানের কথা জানা যায়। ততদিনে হটী মারা গিয়েছেন।
পুড়বে মেয়ে উড়বে ছাই তবে মেয়ের গুণ গাই। অনেকেই কিন্তু আবার এনার সঙ্গে হটু বিদ্যালঙ্কারকে গুলিয়ে ফেলেন। এর জন্য খানিকটা দায়ী আমাদের স্মৃতির আলস্য, আর খানিকটা দায়ী নারায়ণ সান্যাল।
নারায়ণ সান্যাল তাঁর রূপমঞ্জরী উপন্যাসে বলেছেন, দুই মনীষী হটু বিদ্যালঙ্কার আর হটী বিদ্যালঙ্কারকে নিয়ে তাঁর মানসকন্যা রূপমঞ্জরীর নির্মাণ। কিন্তু তিনি উপন্যাসের নায়িকার নাম রেখেছেন রূপমঞ্জরী যিনি আবার প্লট অনুযায়ী কুলীন ব্রাহ্মণকন্যা ও পরে কুলীন বিধবা। গোলমালটা বাধল এখানেই। কারণ আসল রূপমঞ্জরীর গল্পটা অনেক আলাদা।
আসল রূপমঞ্জরী? এখানেও নকল হইতে সাবধান! অন্তত জাতিভেদ প্রথা ও বর্ণবাদী প্রিভিলেজ হইতে সাবধান তো বটেই! ১৭৭৫ সালে বর্ধমান জেলার কলাইঝুটি গ্রামে এক মধ্যবিত্ত অব্রাহ্মণ পরিবারে হটু বিদ্যালঙ্কারের জন্ম হয়। তাঁর বাবা নারায়ণ দাস, মায়ের নাম ছিল সুধামুখী। হটু বিদ্যালঙ্কার তো আর তাঁর আসল নাম নয়। বাবা-মা তাঁর নাম রেখেছিলেন রূপমঞ্জরী। এরপর এক অব্রাহ্মণের মেয়ে হয়ে শাস্ত্রপাঠ করে হটু কিভাবে বিদ্যালঙ্কার হলেন, আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি লাভ করলেন, চরক সংহিতার অন্যতমা বিশ্লেষক হলেন, সে কাহিনি নিয়ে আজও কোনও উপন্যাস লেখা হয়নি।
আচ্ছা, এই হটু বিদ্যালঙ্কার আর কাদম্বিনী গাঙ্গুলির একটা গল্প আছে কিন্তু! হটু ছিলেন কাদম্বিনীর ঠাকুমার সময়ের মানুষ। তবে শোনা যায় তিনি কাদম্বিনীর ঠাকুমাকে শক্ত অসুখ থেকে সারিয়ে তুলেছিলেন। মেয়েদের ডাক্তারি শেখার প্রয়োজন সেই থেকেই নাকি রোগিনীর ছেলে ব্রজকিশোর বসুর মাথায় ঢুকে যায়। এই ব্রজকিশোর বসু হলেন দেশের প্রথম প্র্যাক্টিসিং লেডি ডাক্তার কাদম্বিনী গাঙ্গুলির বাবা। এই কাদম্বিনীকেও স্লাটশেমিং শুনতে হয়েছে বিস্তর, ডাক্তারি করার অপরাধে। যদিও তাঁকে মুছে ফেলা যায়নি।
অবশ্য তাতে পিতৃতন্ত্রের ডিলিট কালচার খুব কিছু বাধা কবে পেয়েছে? যে হিসেবে বিকট নিতম্বার গল্প কালিদাসের নামে হাইজ্যাক হয়ে গেল, হটি বিদ্যালঙ্কারের পরিচয় মুছে গেল, সেই হিসেব ধরে বসলেই দেখতে পাই দেবী থেকে ডাইনী ক্রোনোলজি। কালিদাসের সময় থেকে শুরু করেছিলাম না আমরা? রামায়ণ মহাভারত লেখা হচ্ছে তখন। বাংলা অবধি সে লেখা আসতে আসতে ডাইনী রাক্ষসীরা সবাই ততদিনে ভিলেন। মুকুন্দবাম চক্রবর্তীর চণ্ডীমঙ্গলে দেখি, খুল্লনা চণ্ডীপূজা করছে দেখে হিংসুটে লহনা ধনপতির কাছে গিয়ে নালিশ করে, "তোমার মোহিনী বালা / শিক্ষা করে ডাইন কলা / নিত্য পূজে ডাকিনী দেবতা।"
চৈতন্যচরিতামৃত পড়তে পাই ---
ডাকিনী শাকিনী হৈতে শঙ্কা উপজিল চিতে
ডরে নাম রাখিল নিমাই।
নিমাই - যে ছেলে নিমের মতো তিতো।
সাবধান! পিতৃতন্ত্র সরসর করে নগরসভ্যতার উঁচু পাঁচিল টপকে গাঁয়ে গঞ্জে ঢুকে পড়েছে অচিরেই। ক্ষমতার লড়াই তো একা শহরের নয়! যুগ যুগান্ত ধরে গোপন বিদ্যা আয়ত্ত করে যাওয়া মেয়েদের দলকে এক হাত নেওয়ার সুযোগ কোন জাতি ধর্ম বর্ণের পুরুষই ছাড়তে চায় না।
তবে যে নিগুমা পূজিতা হতেন? ডাইনি তো দেবী স্বরূপা ছিলেন?
বিদ্যেধরীদের নাম মুছে গেছে সে তো দেখাই যাচ্ছে। বর্ণবাদ, ব্রাহ্মণ্যবাদ সব ডংকা বাজিয়ে হাজির! ধীরে ধীরে ডাইনী আর লৌকিক দেবত্বের ধারণা তাই আলাদা হতে থাকে। লৌকিক দেবী মহাকালী চন্ডী দুর্গা তারা মনসা শীতলা পূজার আসনে প্রতিষ্ঠিত হন, পেছনে কাজ করতে থাকে লৌকিক সংস্কৃতির আর্যীকরণের বিনিদ্র প্রক্রিয়া। অণুঘটকের মতো। সে সব দেবী চলে যেতে থাকেন ধরা ছোঁয়ার বাইরে, বাস্তবতার উর্ধে। আর রক্ত মাংসের ডাইনীর দল তাঁদের সমস্ত বাস্তবতা সঙ্গে নিয়ে, জ্ঞান বিদ্যা সঙ্গে নিয়ে লোকসমাজের আড়াল হতে থাকেন। গ্রামের প্রান্তে, স্যাঁতস্যাঁতে জলার ধারে, জঙ্গলের ভেতরে, ঘেন্না, ভয়, কুৎসায় ভরা অনিশ্চিত জীবনে তাঁদের নির্বাসন।
সম্পদের অধিকার এসব ক্ষেত্রে তুরুপের তাস। কে কোথায় বিধবা হয়ে মৃতস্বামীর ভিটে আগলে বসে রয়েছে? ওটা ডাইনি! কোন বাঁজা মহিলা নজর দিয়ে শিশুদের মেরে ফেলছে? ডাইনি! লেখাপড়া শিখছে? এবারে বরকে খাবে। পুরুষমানুষের সঙ্গে চোপা করে? চরিত্রের দোষ। পতিতা। বেশ্যা।
তবে কিনা এসব তো মান্ধাতার আমলের কথা। এখন কি আর এসব কিছু আছে নাকি? এখন যাকে বলে এ আই যুগ!
আধুনিক বাস্তবে আপনাকে স্বাগত। দুহাজার সাল থেকে দুহাজার একুশ অবধি কুল্যে 3077টি ডাইনী হত্যা রিপোর্টেড হয়েছে National Crime Records Bureau তে, একা ঝাড়খণ্ডেই হয়েছে 590 খানা। আর সরকারি খাতায় ওঠেনি যা তার গুণতি কে করে! যাঁরা জানে মরেননি তাঁরা মানে ধনে মরেছেন।
এ ছাড়া জানগুরু-ওঝা-তুকতাক দুনিয়ার বাইরেও এক বিরাট সমাজ আছে যেখানে নিরন্তর ডাইনি, বিদ্যেধরী বলে দাগিয়ে দেওয়া যায় যাকে খুশী, যখন খুশী। মহিলাটিকে শুধু খানিক চেনা ছকের থেকে আলাদা হতে হবে। কটুভাষী, স্বার্থপর হলে তো হয়েই গেল। মেয়েদের জিভ অত ধারালো হবে কেন? মেয়েরা কেন স্বার্থপর হবে? মেয়েদের কেন ক্ষমতা হবে? বেশি টাকা আছে? অনেকগুলো বিয়ে? ওটা ডাইনী!
ছাপোষা পাড়ার প্রতিবেশীনি হন, কিংবা ছায়াছবির জগতের ব্লকবাস্টার নায়িকা, কিংবা দেশের মহিলা প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রী! পিতৃতন্ত্র আমাদের যেমন দেখায় আমরা দেখি। যেমন শেখায় আমরা শিখি। আর প্যাটার্ন যদি ভেঙে যায়?
তাহলে তুমি বিদ্যেধরী! অচিরেই মুছে যাওয়া ছাড়া আর কোনও ভবিষ্যৎ আছে তোমার?
ছিলো কখনও?