ভাষ্য
“মেয়েরা আবার ক্রিকেট খেলে নাকি?”
দাঁড়ান দাঁড়ান, এটা শুধু একজনের মন্তব্য নয়। রেচেল হেহোর গল্পটা বলি।
১৯৪৭ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষের পরে ইংল্যান্ডে তখন ঘর গোছানোর পালা চলছে। এমন সময় এক বিকেলবেলা একদল চ্যাংড়া ছেলে রাস্তায় ক্রিকেট খেলছে দেখে তাদের পুলিশ গিয়ে ধরল। একুশে আইনের দেশ ইংল্যান্ডে তার একশো বছর আগে থেকে কড়া নিয়ম ছিলো পাবলিক প্লেসে খেলাধুলা করা যাবে না। তো পুলিশ গিয়ে ছেলেপুলেদের ধরল। একটা মেয়েও ছিলো খেলার দলের মধ্যে। পুলিশ তাকে বলল,
“ওহে খুকি, বাড়ি যাও দেখি? বাকিরা আমার সঙ্গে এসো। কুইক!”
ছেলেদের দল বোধ হয় বলার চেষ্টা করেছিল খুকিও একই অপরাধে অপরাধী, কিন্তু পুলিশ সেসব কথা কানেই তুলল না। তাদের একটাই কথা, মেয়েরা আবার ক্রিকেট খেলে নাকি? এসব চ্যাংড়াদের হুজ্জুতি বই তো নয়?
খুকি সেদিন বড় অপমানিত হয়ে বাড়ি ফিরেছিল। পুলিশের লম্বা লম্বা বুলির জবাব সে না হয় ব্যাটেই দিয়ে দিত আরও লম্বা লম্বা ছক্কা হাঁকিয়ে, ব্যাট বল কেড়ে না নিলে দেখিয়ে দিতই।
দিয়েছিল। এই ঘটনার ষোল বছর পরে ১৯৬৩ সালে মেয়েদের টেস্ট ক্রিকেটের প্রথম ছক্কা আছড়ে পড়বে অস্ট্রেলিয়ার ওভালে, সেদিনের সেই খুকির ব্যাট থেকে। রেচেল হেহো তাঁর নাম। লর্ডসের মাঠে মেয়েদের প্রথম ক্রিকেট ম্যাচ আয়োজন করার প্রস্তাব পেড়ে মিডিয়ায় শোরগোল ফেলে দিয়েছিলেন তিনি। রেচেল হেহো।
কিন্তু লর্ডসে মেয়েদের ম্যাচ ছেলের ম্যাচ আবার কী? লর্ডস হলো হোম অফ ক্রিকেট। সেখানে তাদের দেশের খেলা হবে এটাই তো স্বাভাবিক?
না মশাই! লর্ডসকে হোম অফ ক্রিকেট যাঁরা বলেছেন তাঁরাই আবার ভালো করে দাগিয়ে দিয়ে বলেছেন ক্রিকেট হলো জেন্টলম্যানস গেম। ইংল্যান্ডের ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটের জেন্টলমেন টিমের ডব্লিউ জি গ্রেস সেই কোনকালে বলেছিলেন মেয়েরা ক্রিকেট খেলে না, সে কথা মনে আছে? তাঁর নিজের মেয়ে বেসি ক্রিকেট খেলত, তাও তিনি নাক সিটকে বলেছিলেন বেসির সতেরো পেরিয়ে গেছে, ছুঁড়ি এখন বুড়ি। ক্রিকেট আবার মেয়েরা খেলে নাকি?
তা ডব্লিউ জি গ্রেসের বয়স তখন কত?
ডব্লিউ জি গ্রেস তখন মাত্র সাতচল্লিশ। আমাদের পৃথিবীতে ছেলেদের সাতচল্লিশ বছর মেয়েদের সতেরোর চেয়ে কমই হবে! ঊনবিংশ শতকে যখন গ্রেস ব্যাট ধরছেন, তখনই ক্রিকেট উচ্চঘর উচ্চবংশের রাজপুরুষদের খেলা বলে নন্দিত বন্দিত। আর জেন্টলম্যান অর্থে ইংরেজরা ওই রাজপুরুষই বুঝে এসেছে বহুকাল। এমনকি স্বয়ং ইংলন্ডেশ্বরী এলিজাবেথকেও লর্ডসে ঢুকে কথা শুনতে হয়েছিল। ভাবা যায়?
ঘটনা এক শনিবারের বারবেলার। অ্যাসেজ চলছে লর্ডসে। এক সাংবাদিক হন্তদন্ত হয়ে লর্ডসের প্রবাদ প্রতিম কমিটি রুমে ঢুকতে গিয়ে দেখেন এক ভদ্রমহিলা সেখানে বসে আছেন। কি অসামান্য স্পর্ধা! ক্রিকেটের পবিত্র মক্কা লর্ডসে মেয়েছেলেরা তখন খেলে না তো বটেই, পবিত্রতম লংরুম আর কমিটিরুমেও তাদের প্রবেশ নিষেধ। কমিটিরুমে মহিলা দেখে সাংবাদিকের কিডনিতে হার্ট অ্যাটাক হলো। প্রবল চিৎকার চেঁচামেচি জুড়লেন তিনি। সতীর্থরা এসে তাঁকে বোঝালেন আরে মশাই, ওটা কুইন এলিজাবেথ। রানী হলে আলাদা নিয়ম, দেশে তাঁর অগম্য স্থান নেই। সাংবাদিক সোয়ানটন সব শুনে টুনে মুখ তোমবা করে ঘোঁত ঘোঁত করে উঠলেন,
“রানী হোক, নারী তো। কমিটিরুমে মেয়েছেলে ঢুকে পড়েছে।”
খেলার মাঠে নারী হওয়ার দায় রানীকেও নিতে হয় তাহলে?
সে বরাবর নিতে হয়েছে। সাক্ষী আছে অলিম্পিয়ার প্রথম মহিলা সোনাজয়ী সিনিস্কার মূর্তি। সেখানে খোদাই করা আছে:
“স্পার্টার রাজা আমার বাপ, আমার ভাই স্পার্টার রাজা। কিন্তু আমি, সিনিস্কা, দ্রুতঅশ্ব রথে জয়ী, আমি খাড়া করেছি এই মূর্তি। আমি গ্রীসের একমাত্র নারী যার মাথায় উঠেছে এই বিজয়ের মুকুট।”
ঘোষণার মধ্যে ক্ষমতার দম্ভ আর পিতৃতন্ত্র পাশাপাশি হইহই করে উঠছে। নিয়মের বেড়াজালে ঘেরা অচলায়তনে নিয়মের ফাঁক ফোকর দিয়েই মেয়েদের ঢুকে পড়ার জন্য দায়ী ওই ক্ষমতা বনাম নিয়মেরই রেষারেষি। তখন ঘোড়া জিতলে ঘোড়সওয়ার নয়, প্রাইজ পেত ঘোড়ার মালিক। সিনিস্কা মহিলা হয়েও দুর্দান্ত ঘোড়া চালান, তাদের ট্রেনিং দেন। এদিকে অলিম্পিকে মেয়েদের প্রবেশ নিষেধ। সিনিস্কার ভাই বুদ্ধি দিলেন রথ পাঠিয়ে দিতে। মাঠে নামার দরকার নেই, তার জন্য লোক আছে। মাঠে না ঢুকেও চ্যাম্পিয়ন হয়ে গেলেন সিনিস্কা। ইতিহাস তৈরি হলো।
অথচ এই চতুর্থ শতাব্দীতেই অলিম্পিকসে ঢুকে পড়লেন এক মহিলা। রাজার মেয়ে রাজার বোন নন, তাই ইতিহাস তাঁর মূর্তি বানিয়ে রাখতে পারেননি। কিন্তু মেয়েরা নিয়ম ভাঙলে ইতিহাসের পক্ষে ভোলাও তো সম্ভব হয় না?
ইতিহাস কাল্লীপাতেরাকে ভোলেনি। ছেলে পেইসিরোডসকে নিজের হাতে মার্শাল আর্ট শিখিয়েছিলেন তিনি। অলিম্পিক গেমসের সবচেয়ে কঠিন ও হিংস্র খেলার একটি, প্যানক্রেশন।প্রতিযোগীরা প্রায় সব কিছুই করতে পারত — মেরে, আছড়ে, চেপে ধরে, শ্বাসরোধ করে প্রতিপক্ষকে পেড়ে ফেলো। বিজয়টাই ছিলো মুখ্য। সেবার পেইসিরোডস জিতে গেলেন। রিংয়ের বাইরে জনতার চিৎকার ছাপিয়ে ভেসে এলো এক তীক্ষ্ণ কণ্ঠ, "সাব্বাস বেটা"!
সারা গ্যালারি স্তম্ভিত। নগ্ন পুরুষদের খেলার মাঠে বিধবা এই মেয়ে কোথা থেকে এলো? এমন অনাচারের সাজা এক এবং একমাত্র মৃত্যু। কে এই মেয়ে?
মাথা উঁচু করে কাল্লীপাতেরা ঘোষণা করলেন,
“আমি আগে চ্যাম্পিয়ন পেইসিরোডসের গুরু। তারপর আসে আমার মহিলা পরিচয়। অলিম্পিয়ায় গুরুর প্রবেশ অবাধ।”
নিয়ম মেয়েদের জন্যই প্রথম তৈরি হয়েছিল। নিয়ম ভাঙার কৌশল মেয়েদের থেকে ভালো আর কেই বা জানবে? নিয়ম তাই কঠিনতর হয়েই থাকে। এই ঘটনার পর প্রাচীন অলিম্পিয়ায় নিয়ম হলো সব প্রশিক্ষককে নগ্ন অবস্থায় মাঠে প্রবেশ করতে হবে, যাতে কেউ আর নারীর ছদ্মবেশে ঢুকতে না পারে।
এর মাত্র হাজার দুই বছর পর লর্ডসে বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচ। হঠাৎ করেই ভারতীয় দর্শকের ঘুম ভেঙেছে, সবাই খোঁজ নিচ্ছে কখন কোন চ্যানেলে ম্যাচ দেখা যাবে? ক্যাপটেন কে? মেয়েদের ক্রিকেটেও পঞ্চাশ ওভার হয়? ক্রিকেটের বিশ্বকাপের কথা উঠলেই তেরঙ্গা আমাদের গোটা দেশ ঢেকে ফেলে, মেয়েদের ক্ষেত্রে তার খুব ব্যতিক্রম হলো না। ২৩ জুলাই ২০১৭। ICC Women’s World Cup 2017-এর ফাইনাল ম্যাচ চলছে। বলিউডের প্রবীণ অভিনেতা ঋষি কাপুর টুইট দাগলেন,
“মেয়েরা জিতলে সেলিব্রেশন যেন ঠিক সৌরভ গাঙ্গুলির ন্যাটওয়েস্ট ট্রফি জেতার রিপিট হয়! ঠিক আছে? ইয়ো!
২০০২ সালে ন্যাটওয়েস্ট ট্রফি জিতে সৌরভ গাঙ্গুলির জামা খুলে টপলেস সেলিব্রেশন আমরা কেউ ভুলিনি। তাহলে মেয়েরা জিতলে জামা কাপড় খুলে ফেলবে না কেন? কিসের তাহলে এত জেন্ডার ইকুয়ালিটি, উঁ? নারী পুরুষ বুঝি সমান সমান? সত্যি?
এই তো টিপিকাল মেল গেজ!! আইয়ে আপকা ইন্তেজার থা! মেয়েদের ঘাম, হাসি, কান্না খামোখা কে দেখবে? ঘামে ভেজা শরীর, তার বুকের খাঁজ, তার নিতম্বের গড়ন, এই তো দর্শকের দর্শকামের বস্তু! লরা মালভে ব্রিটিশ চলচ্চিত্র তাত্ত্বিক। তিনি বলেছিলেন—
“Male gaze হল সেই দৃষ্টি, যার মাধ্যমে নারীকে দেখা হয় পুরুষের আনন্দ ও নিয়ন্ত্রণের জায়গা থেকে।”
ঋষি কাপুরের টুইটের সারমর্ম ছিল—
“পুরুষরা যেমন জামা খুলে সেলিব্রেট করে, মেয়েরাও তা করুক।”
এখানে “জয়” বা “খেলা” নয়, মূল দৃষ্টি ঠেকছে এসে নারীর শরীরে। যে শরীর ধুলোয় ঘাসে জিমখানায় একটা ব্যাট একটা ম্যাট পেতে আকুল ঝাঁপ দিয়ে ফিরেছে। যে শরীর জেনারেল কামরায় গাদাগাদি করে খেলে বেড়িয়েছে দীর্ঘদিন। মেল গেজ মেয়েদের ধুয়াধার ব্যাটিং কিংবা তেরঙ্গার জয় নিয়ে উৎসাহী নয়। টপলেস শরীরের কল্পনাতেই পিতৃতন্ত্র নাল ফেলছে। ইয়ো।
মেল গেজ তো জানে না জামা না খুলেও ইতিহাস লেখা যায়! সেক্সিস্ট জোকাররা জানে না চাকদহ থেকে কলকাতা ট্রেনিং করতে আসার জন্য রাতভোরে বেরোতে হত ঝুলন গোস্বামীকে। খেলার জুতো, বলের দাম, সংসার খরচ জোগাড় যতটা কঠিন ছিলো, হাসি ঠাট্টার ভাড়ামো পেরিয়ে সিরিয়াস খেলার দর্শক জোটানো ছিলো তার চেয়ে ঢের বেশি কঠিন।
প্রশ্নটা হলো, খেলার মাঠ কি তাহলে সমাজের আয়না? ক্রিকেটের মতো একটা এলিট খেলাতেও মেয়েরা সমাজের কানাগলির মতন অদৃশ্য হয়ে থাকবে?
আসলে খেলার মাঠে যে থাকে, আর গ্যালারিতে যে থাকে — দুজনের অবস্থান সমাজের কাঠামোই তো বোঝায়।যেখানে একদিকে “গেমস ভিলেজ”, “বিজনেস লিগ”, “ব্র্যান্ড স্পনসর”, আর অন্যদিকে? — শ্রম, মাঠের ঘাম, আর লবি। অদৃশ্য প্রান্তিকতা। আবার সেই খেলার মাঠই যখন পুঁজির রঙ্গমঞ্চ হয়ে ওঠে, অচলায়তনে ফাটল ধরতে শুরু করে। নিয়মভাঙার খেলা ঢুকে পড়ে খেলার মধ্যেও।
এই যেমন এই সেদিনও ব্রিটিশ ক্লাব ক্রিকেট ছিল শুধুমাত্র সাহেবদের জন্য। কালো খয়েরি চামড়া দূরে থাক, বিদেশি ক্রিকেটার অবধি আসার হুকুম ছিলো না ইয়র্কশায়ারে। শতাধিক বছরের এই নিয়ম ভেঙ্গে খেলতে ডাকা হয়েছিল সবে উচ্চ মাধ্যমিক দিতে বসা উনিশ বছরের এক ভারতীয়, সচিন তেন্ডুলকরকে। ১৯৯২ সাল। পোস্ট লিবারাইজেশন হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ছে আমাদের ড্রইং রুমে। ভিউয়ারশিপ বস্তুটা বিশ্বের ক্রিকেটে নতুন বাজারের জন্ম দিচ্ছে, উপমহাদেশের দিকে স্পনসরের চোখ পড়বে না তা হয়?
হুঁ হয়। সচিন ইয়র্কশায়ার উড়ে যাওয়ার চোদ্দ বছর পরের কথা। রামের বনবাস শেষ হয়েছিল চোদ্দো বছরে, কিন্তু আমাদের মেয়েরা? Women’s Cricket Association of India (WCAI) গঠিত হয়েছিল সেই ১৯৭৩ সালে, মহিলাদের ক্রিকেটকে স্বতন্ত্রভাবে সংগঠিত করার উদ্দেশ্যে।এর প্রথম দিককার নেত্রীদের মধ্যে ছিলেন ডায়না এডুলজি, শান্তা রঙ্গাস্বামী, চন্দ্রকান্তা আভাদের মতন প্রথম প্রজন্মের খেলোয়াড়রা। তাদের এমন হাড়ির হাল যে ইংল্যান্ডে খেলতে যাচ্ছে ভারতের ক্রিকেট টিম, মিতালি রাজ ক্যাপ্টেন। তাঁদের প্লেনভাড়া নেই। কারণ মেয়েদের ক্রিকেটের বাজার নেই। মন্দিরা বেদী বিজ্ঞাপনের মডেলিং করে যা টাকা পেয়েছিলেন দিয়ে দিলেন ক্রিকেট টিমকে।
দিন বদলায়, রং বদলায়। এই ২০০৬ সালে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এক বড় পরিবর্তন আসে। International Cricket Council ঘোষণা করে: সব সদস্য দেশকে নারী ক্রিকেটের জন্য একটি একীভূত বোর্ড রাখতে হবে। আলাদা পুরুষ ও নারী বোর্ড চলবে না। ফলে ভারতীয় নারী ক্রিকেট বোর্ড, অর্থাৎ WCAIকে BCCI–র সঙ্গে মার্জ করা হয়।
ঘটনার পাঁচ বছর পরের কথা। সচিব দ্রাবিড় যুগ পেরিয়ে ধোনি সাম্রাজ্য বিদ্যমান। যে ভারত এক হয়ে যেত ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট ম্যাচের সময় সে আবার ভাগ হয়ে যাচ্ছে কলকাতা মুম্বই হাইদ্রাবাদ চেন্নাই, কারণ সেনসেশনের নাম আইপিএল।
২০১১ সাল। ইতিহাস আরেকবার জানল মহিলাদের ক্রিকেট আসলে সময়ের অপচয়।
কী ব্যাপার?
শ্রীনিবাসন তখন বিসিসিআই প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। ওয়াংখেড়েতে ডায়ানা এডুলজি গেলেন কংগ্রাচুলেট করতে। কে ডায়ানা মনে আছে তো?
ডায়ানা এডুলজিকে ভোলা যায়? তিনি তো সেই জমানার ইন্ডিয়া ক্যাপ্টেন যখন কপিল, গাভাস্কার খেলছেন।প্রথম প্রজন্মের বোলিং অলরাউন্ডার, যখন মেয়েদের দল দেশের হয়ে নিজের টাকায়, নিজের ছুটির দিন খরচ করে খেলতে যেত। মেয়েদের জন্য তখন কোনো তহবিল ছিলো না। সংসার চাকরি সামলে খেলবে? তা ভালো! যাতায়াত, হোটেল, ইউনিফর্ম — সবকিছু নিজেদের দায়িত্বে। যাও যাও, দেখ দায়িত্ব নিতে কেমন লাগে? বিয়ে করে সুখে জীবন কাটাও, তোমরা মেয়েরা আবার স্ট্রাগল কি বোঝো হে?
অগত্যা অনেক সময় ডায়নারা নিজের অফিসের মাইনে থেকে ম্যাচ ফি, ট্রাভেল খরচ মেটাতেন। কিন্তু খেলা থামাননি। ক্রিকেট থেকে অবসর নেবার পর তিনি মেয়েদের ক্রিকেটের ফান্ডিং জোগাড় করতে উঠে পড়ে লাগলেন। ২০০৬ থেকে তিনি বিসিসিআইয়ে বসে মেয়েদের টিমের জন্য ফান্ড জোগাড় করে বেড়াচ্ছেন। তো ডায়ানা গেলেন শ্রীনিকে হার্দিক শুভকামনায়ে দিতে। শ্রীনি উত্তরে বললেন,
“পারলে আমি মহিলাদের ক্রিকেট খেলা বন্ধ করে দিতাম। খালি টাকার শ্রাদ্ধ। পারফরমেন্স কই? ক’টা দেশ এভাবে মেয়েদের পেছনে ইনভেস্ট করছে?”
পরে ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে ডায়ানা এই প্রসঙ্গ তুলেছিলেন।
আচ্ছা, একটু বেয়াড়া তর্ক করি। ট্রফি জেতার আনন্দ কতটুকু পেত আমাদের পুরুষ ক্রিকেটের নয়ের দশক? টিভির সামনে ব্ল্যাক ম্যাজিক তুকতাক করে উইকেট ফেলা এবং রান তোলার আমাদের সেসব ছেলেমানুষীর আড়ালে আবার আবার হেরে যাবার গেল গেল ভয় ছাড়া আর কি বা থাকত? হেরে গেলে তো সেই জুতোর মালা, অপয়া বউ বিয়ে করে ফর্ম পড়ে গেছে, কিংবা ডাইনি গার্লফ্রেন্ড ছেলেটার মাথা চিবিয়ে খেয়েছে।
তা কোনও কেষ্ট বিষ্টু বলতে পেরেছিলেন নাকি, খালি হারে, পারলে ছেলেদের ক্রিকেট খেলা বন্ধ করে দেবো? মুরোদ ছিলো কারোর উঠতি সফ্ট ড্রিংকসের বাজার অবহেলা করে ক্রিকেটের বারোটা বাজানোর?
ধোর, পেট গরম নাকি? ছেলেদের জন্য গালিগালাজ অবধি ঠিক আছে। পরীক্ষায় খারাপ নম্বর পেলে পড়াশোনা বন্ধ করে বিয়ে দিয়ে দেওয়ার থ্রেট ছেলেদের জন্য নাকি? এক গাল ট্যালট্যালে হাসি নিয়ে সেই জাদুটোনা যুগের বঙ্গ-সম্রাট সৌরভ গাঙ্গুলি টক শোতে যদি বলেই থাকেন, “মেয়েদের ক্রিকেট খেলার কোনও দরকার নেই”, তাহলে ওটুকু বাদ দিয়ে বাকি ইন্টারভিউটা শোনা যেতেই পারে? দেড় ঘণ্টার টক শোতে দু মিনিটের একটুখানি বৈষম্য আছে, তাতে কী?
সত্যিই তো! ধরুন একটা মেয়ে ট্রেনে চড়ে কোথাও যাচ্ছে। ধরুন মামার বাড়িই যাচ্ছে। দেড় ঘণ্টার জার্নি জানলার ধারে বসে তাই তাই তাই মামার বাড়ি যাই করতে করতেই কেটে গেল। মাঝে শুধু একটা লোক শুনিয়ে শুনিয়ে বলল, “লেডিস কম্পার্টমেন্টেও উঠবে আবার জেনারেল কামরায় ছেলে দেখতে উঠে জানলার ধারও নেবে। মামার বাড়ি পেয়ে বসেছে!” এতে আর কি আর এমন হলো বলুন, অত ধরলে চলে?
ধরলে চলে না জেনেও ছাড়া কি আর যায়? সাক্ষী মালিক, বিনেশ ফোগাট, বজরং পুনিয়া আমাদের সোনার ছেলে মেয়েরা ছাড়তে তো পারেননি? তেরঙ্গা পতাকা বুকে নিয়ে ভারতের কুস্তিগীররা দিনের পর দিন রাজধানীতে রাস্তায় ধরনায় বসেছিলেন রেসলিং ফেডারেশনের প্রধান বৃজভূষণ শরণ সিংহের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ নিয়ে। বিচার চেয়ে তাঁরা মেডেল নামিয়ে রেখে বলেছিলেন,
“আমাদের গলা শোনা না গেলে, এই মেডেল আর দরকার নেই।”
বৃজভূষণ হোমরা চোমরা লোক, এইসব ছোট্ট ঘটনায় তাঁর বিশেষ কোনও ক্ষতি হয়নি। বঢ়ি বঢ়ি দেশো মে অ্যাইসি ছোটি ছোটি বাতে হতেই পারে সেনরিটা, এমনটা তো হয়েই থাকে? এই যে বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের আগে অস্ট্রেলিয়ার মেয়েরা রাতে বাইরে বেরিয়ে যৌন হেনস্থার শিকার হলেন। মহান মন্ত্রী কৈলাশ বিজয়বর্গীয় কী বললেন?
অতিথি দেশের ক্রিকেটাররা সিকিউরিটি নিয়ে যাননি কেন? দোষ তো তাঁদের!
একদম সহি বাত বোলা। মহিলা হয়ে জন্মেছ, অত কী হে? আমাদের দেশের প্রাচীন প্রবাদ আকেলি লড়কি খুলি তিজোরি। কাজেই রাত করে বেরোলে সিকিউরিটিকে বলতে হবে। নয়ত শ্লীলতাহানির দায় ভিক্টিম মেয়েদের ওপরেই বসছে হরবখত, ওনিয়ে চিন্তার কী? ভিক্টিমকে দোষ দেওয়ার এই অপূর্ব অভ্যাসের নামই হলো ভিক্টিম ব্লেমিং। ছোট কাপড় পরেছে বলেই তো ছেলেগুলো দুষ্টুমি করে ফেলল। বগলকাটা ব্লাউজ পরল বলেই ব্লেড চালিয়ে দিল। দলিত মেয়ে হয়ে মনীষা বাল্মীকি জন্মালেন বলেই তো উচ্চবর্ণের ঠাকুরদের একটু ভুল হয়ে গেল। পিতৃতন্ত্রের এই ভ্যালিডেশন বারবার জাত, গায়ের রং, আর্থিক সংগতি ভেদে এক এক রকম হয়ে দেখিয়ে দিয়েছে ক্লাস যাই হোক, মেয়েদের কপালে লিখিতং ঝাঁটা।
অথচ সেসব ফাটা কপাল নিয়েই মেয়েরা দল বেঁধে ভালো খেলছেন, চুটিয়ে খেলছেন। এই মার্চে এশিয়ান গেমসে সোনা এনেছেন কবাডির মেয়েরা। পরপর দু বছর তেইশ আর চব্বিশ এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন্স জিতেছেন হকিতে। ইতিহাসের সেরা সময় চলছে ক্রিকেটে। দলগত খেলায় এগিয়ে যাওয়ার মানে কেবলই পিছিয়ে পড়া এডজাস্ট করা মেয়েরা খুব ভালো জানে কিন্তু।
সেই জন্যেই হরমনপ্রীত ম্যাচ জেতার ক্যাচ লুফে যখন পাখির মতন দৌড় লাগান, গ্রাম শহর মফস্বল থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে মেয়ে, জীবন্ত মেয়ে, অসময়ে পুড়ে যাওয়া মেয়ে, না জন্মাতে পারা মেয়ে বুকের মধ্যে থাকা ডানা মেলে ছুটতে শুরু করে। হয়তো পরের স্টেশনেই থেমে যেতে হবে, হয়তো মুখ থুবড়ে ডানা ভেঙ্গে পড়ে যাবে তারা, হয়তো ভিউয়ারশিপের দায় বাজারকে শিগগিরই নিয়ে যাবে অন্য অভিমুখে। তাও সব কিন্তু যদি শাসানি ধমকানি পেরিয়ে রাত থাকতে রাস্তায় বেরিয়েই পড়বে ঝুলন গোস্বামীর মতন, ছেলে সেজে খেলতে ঢুকে পড়বে শেফালির মতন কোনও কোনও সিস্টেম গ্লিচ মেয়ে। সিস্টারহুডের মুঠো আরও শক্ত হবে।
গ্লিচ বাড়ছে। সিস্টেম পাল্টাচ্ছে। সমানাধিকার অনেক দূরের রূপকথা, কিন্তু…
সবকিছুরই একটা প্রথম তো থাকেই! মেয়েরা কী খেলতে পারে তাই নিয়ে ছেলেখেলা তো অনেক হলো। মেয়ে-খেলা হতে দোষ কী?
কৃতজ্ঞতা স্বীকার
আমাদের কৃতজ্ঞতা ক্রিকেট ঐতিহাসিক অভিষেক মুখার্জিকে, তাঁর লেখার রেফারেন্স আমাদের সামনে ইতিহাসের দিক খুলে দিয়েছে। আমাদের কৃতজ্ঞতা নারায়ণ সান্যালের প্রতি, প্রাচীন অলিম্পিক তাঁর চোখে না দেখলে আমাদের বোধোদয় হত না। আমরা কৃতজ্ঞ রণিতা চ্যাটার্জি, শতাব্দী দাশ, রাকা দাশগুপ্ত, অদিতি বসু রায়ের কলমের প্রতি। রিসার্চ সহায়তা: ডঃ সোমদেব ঘোষ।
ঝরঝরে কথোপকথন! পড়ে ও শুনে ভালো লাগল।