ভাষ্য
বাঙালির রথ আসে পাঁপড় ভাজা মড়মড়িয়ে আর জিলিপির রস ঝরঝরিয়ে। ঐতিহ্য না লোকাচার? দূর মশাই, সব এসে মিলে যায় ভিয়েনে বসানো পেল্লাই কড়াইয়ের টগবগে তেলে। রথের দিনে জিলিপি, পাঁপড় ভাজা খাওনি? অ্যাই তুমি বাঙ্গালি তো? অথচ এই দু’টি খাবারের একটির জন্মও সম্ভবত বাংলায় নয়। পাঁপড় এসেছেন খাস সিন্ধমুলুক থেকে, আর জিলিপি আফগানিস্তান থেকে - এমনটাই বলে থাকেন অনেকে। ঋতেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর 'মুদির দোকান' বইতে কী বলছেন? বলছেন সংস্কৃতে জলবল্লী বলে একরকম মিষ্টির উল্লেখ আছে, তাকে অনেকেই জিলিপি বলে মনে করেন। তবে তাঁর মতে জিলিপির প্রাচীন নাম জলবল্লী নয়, কুন্ডলিকা। জলবল্লী হলো গিয়ে ছানার জিলিপি। কুন্ডলিকাই যথার্থ জিলিপি। যার মধুর প্যাঁচে বাঁধা পড়ে আছে আফগানিস্তান থেকে গঙ্গাহৃদি। এ হেন মিঠাই রাজা রাজড়াকে বশ করে ফেললেও পাবলিক টাচ হারায়নি। নিঃসংকোচে কাগজের ঠোঙায় চেপে জিলিপি যেমন ট্যাঁকসই মিঠাই, তেমনই বাঙ্গালির রসনার টেকসই স্যাঙাত।
পাঁপড়ের কাহিনী কিছু অপরিষ্কার। নানা রকম ডালবেটে বেলন চালনার মুন্সীয়ানায় জিরো ফিগারের খাদ্য বস্তুটি আসমুদ্র হিমাচলে তুমুল জনপ্রিয়। সেই দেড় হাজার বছর আগে জৈন রেফারেন্স পাচ্ছি আমরা, জৈন ধর্মপ্রচারকরা লম্বা রাস্তা পাড়ি দেওয়ার সময় থলিতে নিচ্ছেন পাপড়, গরমে নষ্ট হওয়ার ভয় নেই। মেয়েদের দল একসঙ্গে জোট বেঁধে পাপড় বেলছে,- এই দৃশ্য খুব নতুন নয়।
নদীর দেশ, বৃষ্টিঝরার দেশ বাঙ্গলার কাছে পাঁপড়কে আঁচলে বেঁধে রেখেছে খিচুড়ি। ধুতির খুঁটেও বলতে পারেন। ইনফ্লেশন আর কস্ট কাটিং এর কালে পাঁপড় ভাজা বড় আপনার। সেই অর্থে জিলিপি পাঁপড় - দুইজনেরই মানিব্যাগের সাইজ নিয়ে তেমন মাথাব্যথা নেই। রথযাত্রা ব্যাপারটা এমনিতে রাজকীয়। সোনার ঝাঁটা, ছাপান্ন ভোগ, প্রকাণ্ড মূর্তি, প্রকান্ড রথ এসব তো ম্যান্ডেটরি। তবু দেখুন, জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রা ঐ ছোট্ট কাঠের রথগুলোয় চেপে কচি কচি হাতের দড়ির টানে নড়বড় লগবগ না করলে উসখুশ করেন। একটু বাতাসা, কয়েকটা নকুলদানা না পেলে হয়? দেবতা গা মুড়মুড়ি ব্যারাম নিয়ে রথের আগে চোদ্দো দিন পথ্য করেছেন, মুখ ফেরাতে হবে তো?
দেবতার পথ্য? কি আজব কথা?
মহাপ্রসাদ নয়, একেবারে লিকুইড ডায়েট, যাকে বলে পান ভোগ, সঙ্গে ভেষজ অনুপান। আটা, কাঁচা মুগ, আম, কাঁঠাল আর কবিরাজি মোদক দিয়ে পথ্য করে দেবতা সেরে উঠবেন। তখন চেঞ্জে যেতে হবে। অবশ্যই রথে চেপে। তাহলে স্নানযাত্রার পর চোদ্দদিন হোম আইসোলেশনে থেকে পথ্য টথ্য করে দেবতা যখন গা ঝাড়া দিয়ে উঠছেন, রথযাত্রার উৎসবে জাত ধর্ম একপাশে ফেলে গণদেবতার লাইন পড়ছে, কোথায়? কেন? জিলিপি পাঁপড়ের দোকানে!
কিন্তু জিলিপি পাপড় নিয়ে তেমন প্রবাদ নেই যেমন আছে কলা নিয়ে। কথাতেই তো আছে রথ দেখা কলা বেচা। নিখাদ বাঙালি কথা, ব্যবসার মার্কেটিংয়ের আপ্তবাক্য। এই প্রবাদের সূত্র খুঁজতে গেলে পিছিয়ে যেতে হবে প্রায় আটশো বছর। পেতে হবে একটি নাম।
ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারী।
আমরা রথের মেলা, মেলার খাবার, প্রবাদ আর ধ্রুবানন্দে ফিরছি, তার আগে একটা জরুরি পয়েন্ট দেখে নিতে হবে। দেবতার শরীর খারাপ, আরোগ্য, আমাদের যেমন লোকাচারের সন্ধান দেয়, তার চেয়ে কত আলাদা - দেবীর শারীরবৃত্তিয় ঘটনা?
লোকদেবী ভূদেবী আবার ওড়িশায় হলেন জগন্নাথের স্ত্রী।
রথযাত্রা তো আষাঢ় মাসে, আমরা তার গোড়ার দিকে গেলে দেখব অরণ্যষষ্ঠীর কয়দিন পরেই মিথুন সংক্রান্তি, এই সময় ভূদেবীর সূত্রে রজোৎসব পালিত হবে তিনদিন।
এদিকে আষাঢ় মাসে মৃগশিরা নক্ষত্রের তৃতীয় দশার শেষে তিনদিনের অম্বুবাচী উৎসব। মানে রথযাত্রার প্রায় ঘাড়ের ওপরেই বলা যায়।
কামাখ্যা। প্রতি বছর অম্বুবাচীর বিরাট উৎসব হয়, মেলা বসে। অথচ মন্দিরে মন্দিরে দেবী লাল চাদরে ঢাকা। গৃহদেবতার পুজো অনেকে বন্ধ রাখেন। তাতে ধরিত্রীর রজৎসবে বাধা নেই এখানে। তাহলে আসুন, শুনি, প্রজনন আর উর্বরতার উৎসবে আমাদের খাওয়া দাওয়া নিয়ে কী জানা যায়?
আচ্ছা মেয়েরা কী খায়? খাবি খায়, আদর খায়, গালি খায়, বাড় খায়, কিল খায়, ফুটেজ খায়, খিদে পেলে কথা খায়, এই? আর কী খেয়ে মেয়েরা ঠিক ঠিক মেয়ে হয়ে ওঠে? কুলের আচার, কারেন্ট নুন, আমমাখা, লেবুজরা, ডাঁশা পেয়ারা ভালোবেসে না খেলে মেয়েজন্ম সার্থক হয় না, এ কথা সবাই জানে। আমাদের পথের পাঁচালীর দুর্গা ম্যালেরিয়ার ঘোরে ভাত খেতে চেয়েছিল, সর্বজয়া দেননি। মেয়েদের ডায়েট চার্ট, খাবারের বিধিনিষেধ আজকের বস্তু নয়, তারপরে শাস্ত্রের আগে আছে লোকাচার। লখিন্দরকে সাপে কাটল যখন,- বেহুলাকে ভাতারখাগী বলে গাল পেড়েছিলেন সনকা। সেকেলে বলে নাক কোঁচকানোর আগে দেখে নিন, রবিঠাকুরের চন্দ্রা রক্তকরবীর মালা পরা নন্দিনীকে আগুনখাকী বলে গাল পেড়েছে কিন্তু।
তবে কিনা এই সব খাবারের ক্যালোরিভ্যালু বড় বেশী দার্শনিক। যা চোখে দেখা যায় তা হল হাঁড়ির উদ্বৃত্ত ভাত, কলমীর ঝোল, মাছের সবচেয়ে ছোট টুকরো, পরিবারের উদ্বৃত্ত উচ্ছিষ্ট, ডিমের অর্ধেক এইসব আর কি!
ঋতুস্রাবের সময় যেমন ধরুন, হাই প্রোটিন ডায়েট তো মাস্ট, মেয়েদের শরীর থেকে যে রক্ত বেরিয়ে যায় তার ঘাটতি পূরণ করতে না পারলে রক্তাল্পতা, দুর্বলতা তো জেঁকে বসবে। মেয়েদের মাংস, মাছ খাওয়ার কোনও বিধান আমরা দেখতে পাচ্ছি না।
মাতৃপূজক সভ্যতার বলি দিয়ে মাংস খাবার প্রথা আমরা দেখেছি, তবে কিনা সেসব পূজো আচ্চার ভার পুরুষের ওপরেই পড়ে সিংহ ভাগ, তাও আমাদের অদেখা নয়। কারা যেন কবে রজস্বলা মেয়েদের অস্পৃশ্য বিধান দিয়ে বসেছেন? মেয়েদের শরীর স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তা ভাবনাগুলো কবে যে গুলিয়ে গেল!
তবে কিনা তাই বলে বৈষ্ণব আর শাক্ত দুই ধারাকে গুলিয়ে ফেললেও চলবে না।
অম্বুবাচীর ডায়েট থেকে প্রোটিন হারিয়ে গেছে, কি আর করা যাবে। এই নিয়ে মন খারাপ না করে আমরা বরং রথের মেলায় যাই। এই, কে এই ধ্রুবানন্দ? চৈতন্যদেবের তিনশো বছর আগে রথের দেবতা পুরী থেকে মাহেশে এলেন কেমন করে? সেই গল্পটাই বরং শুনি?
মামুলি এক বাঙালি সাধু ধ্রুবানন্দ, পুরীতে তীর্থ করতে গিয়েছিলেন। সাধ হল জগন্নাথদেবকে নিজের হাতে ভোগ রেঁধে খাওয়াবেন। কিন্তু পুরীর মন্দির, জগন্নাথদেবের পাহারায় আছেন যাঁরা সেই পাণ্ডাদের ব্যাপারটা মনঃপূত হল না। তাঁরা পার্মিশন দিলেন না। ধ্রুবানন্দ ছাড়বেন না। দারুব্রহ্মকে ভালোবেসেছেন, আর ফেরার পথ নেই। আমরণ অনশনে বসলেন। নীল মাধবের ভক্ত বাৎসল্য প্রবল। তিন দিন পরে ভক্ত স্বপ্নে পেলেন ভগবানকে। জগন্নাথদেব তাঁকে দেখা দিয়ে বললেন, "ধ্রুবানন্দ, বাংলায় ফিরে যাও। সেখানে ভাগীরথী নদীর তীরে মাহেশ নামেতে এক গ্রাম আছে। সেখানে যাও। আমি সেখানে একটি বিরাট দারুব্রহ্ম (নিম গাছের কাণ্ড) পাঠিয়ে দেব। সেই কাঠে বলরাম, সুভদ্রা আর আমার মূর্তি গড়ে পূজা করো। আমি তোমার হাতে ভোগ খাওয়ার জন্য যে বসে আছি গো।"
ফিরে এলেন ধ্রুবানন্দ। মাহেশে এসে সাধনা শুরু করলেন। তারপর এক বর্ষার দিনে মাহেশ ঘাটে একটি নিমকাঠ ভেসে এল। সেই কাঠ তুলে তিন দেবতার মূর্তি বানিয়ে মন্দির প্রতিষ্ঠা করলেন তিনি।
কতদিনের কথা? মাহেশে এসে ধ্রুবানন্দের প্রতিষ্ঠিত বিগ্রহ দেখে আপ্লুত হচ্ছেন স্বয়ং চৈতন্যদেব, বলছেন এ মূর্তি যেন নব নীলাচল। তখন রথের মেলার এত প্রতিপত্তি ছিলো মাহেশে? কই, ভক্তের ভগবান নদের নিমাইকে প্রেমে মায়ায় বেঁধে মাহেশে রেখে দিতে পারলেন কই? সেই তো ভক্তি আন্দোলনের জোয়ার তুলে সোনার গৌর থেকে গেলেন নীলাচলেই। জীবনের চব্বিশ বছর শ্রীক্ষেত্রে শুধু আধ্যাত্মিক মার্গে রয়ে গেলেন বুঝি চৈতন্যদেব? পুরীর রাজা প্রতাপ রুদ্র শেষ অবধি সুলতানশাষিত বাংলা আক্রমণ করলেন না, সে কি চৈতন্যদেবের পরামর্শে?
আচ্ছা বেশ, রথযাত্রা যখন হচ্ছেই তখন পুরীই যাওয়া যাক বরং। রাজা প্রতাপ রুদ্র সোনার ঝাড়ু দিয়ে রাস্তা সাফ করে দিয়েছেন। ভগবান যাবেন ভক্তের নাগাল দিয়ে, ব্রাহ্মণ শূদ্র শ্রেণী বিভাজন এই একটি দিনে মাফ। তখনও দেবতার রোজকার ভোগপ্রসাদে অব্রাহ্মণের অধিকার দুর্লভ। এবার বোঝা যাচ্ছে তো জীবনের শেষ চব্বিশ বছর খরচ করে কোন ভক্তদের অধিকার দিতে লড়ে যাচ্ছেন নদিয়ার নিমাই সন্ন্যাসী? রথের বহর বাহার তাক লাগানো। উপস্হিত জনতা যাতে ভরা বর্ষার কাদায় পিছলে দুর্ঘটনায় না পড়ে, মণ মণ বালি এনে রথের পথে ঢালা হয়েছে।ভক্তের বিপুল সমাগম। শ্রীচৈতন্য দলবল শুদ্ধু কীর্তন করেছেন। সমবেত হরিধ্বনি শ্রীক্ষেত্রের জনতাকে মাতিয়ে দিয়েছে, এবারে ভক্তের ভোগ নিবেদনের পালা। চৈতন্যদেবকে দলবল সমেত খাওয়াতে বসালেন রাজা স্বয়ং। তা কী কী এলো লাঞ্চে? প্রসাদ অবশ্যই, কিন্তু কেমন সেই প্রসাদ?
ছেনা পানা পৈড় আম্র নারিকেল কাঁঠাল
নানাবিধ কদলক আর বীজতাল।।
নারদ ছোলঙ্গ টাবা কমলা বীজপুর
বাদাম ছোহোরা দ্রাক্ষা পিণ্ড খরজুর ।।
মনোহর লাড়ু আদি শতেক প্রকার
অমৃত গুটিকা আদি ক্ষীরসা অপার ।।
অমৃত মণ্ডা ছানাবড়া আর কর্পূরকুলি
রসামৃত সরভাজা আর সরপুলি ।।
এদিকে পুরীর রথযাত্রার কথা হচ্ছে, খাজা কই? মানছি কাকাতুয়া বা নৃসিংহ সুইটস তখনও পসরা সাজিয়ে বসে নি। তাই বলে খাজা থাকবে না ডায়েটে?
এই তো, কৃষ্ণদাস কবিরাজ বলছেন
হরিবল্লভ সেবতী কর্পূর মালতী
ডালিম মরিচা-নাড়ু নবাত অমৃতি ।।
পদ্মচিনি চন্দ্রকান্তি খাজা খণ্ডসার
বিয়োড়ি কদমা তিলখাজার প্রকার ।।
নারঙ্গ ছোলঙ্গ আম্রবৃক্ষের আকার
ফল ফুল পত্র যুক্ত খণ্ডের বিকার ।।
তা এই এত খাবার, সব যে শুকনো মিঠাই! ভাত তরকারি কই?
অন্ন ব্যঞ্জন আছে রে বাবা, তবে রাঘবের ঝালিতে তা তো পাওয়া যাবে না।
রাঘবের ঝালি। চৈতন্যদেবের ভক্ত রাঘব পণ্ডিত। গঙ্গাহৃদির বুকের ধন নদের নিমাইকে প্রসাদ খাওয়ানোর দায় নিচ্ছেন রাঘব পণ্ডিত, চন্দ্রকেতুগড়ের প্রাচীন রাজপুরোহিত বংশে তাঁর জন্ম। তাঁর বাল- বিধবা বোন দময়ন্তী রথের আগে মহাপ্রভুর জন্য রকমারি নাড়ু, মিষ্টি, আচার পাঠাতেন, সারা বছর কীর্তনিয়া দল খেতে পারে এমন পরিমাণে সে সুখাদ্য আসত পানিহাটি থেকে নীলাচল।এই হলো মহাপ্রভুর প্রিয় রাঘবের ঝালি। মিষ্টি ঝাল নোনতা কি নেই তাতে?
দধি দুগ্ধ দধিতক্র রসালা শিখরিনী
সলবণ মুদগাংকুর আদা খানি খানি ।।
নেবুকলি আদি নানা প্রকার আচার
লিখিতে না পারি প্রসাদ কতেক প্রকার ।।
তো কেবল মিষ্টি খেলে তো চলবে বা। চৈতন্যদেব রথের সামনে তাণ্ডব নাচছিলেন। যা ঘেমেছেন না, শরীর থেকে নুন জল অনেক বেরিয়ে গেছে? এই হল তার নিদান। তবে চৈতন্যদেব একা কেমন করে খাবেন?
কীর্তনিয়া পরিশ্রম জানি গৌড় রায়
তা সাবেক খাওয়াইতে প্রভুর মন ধায়
পাঁতি পাঁতি করি ভক্তরে বসাইলা
পরিবেশন করিবারে আপনে লাগিলা
এমনধারা পংক্তি ভোজনে মহাপ্রভু নিজে পরিবেশন করে খাওয়াচ্ছেন, তারপর খেতে বসছেন। ভক্তির বানে ভাসিয়ে দিচ্ছেন ভক্ত ভগবানের শ্রেণী বিভাজন। তখন আচমকা জগন্নাথদেবের রথ গেল থেমে। পালোয়ান যে যেখানে ছিলো ছুটে এসে রথের দড়ি ধরে টানাটানি করতে লাগল। রাজা প্রতাপ রুদ্র ছুটে এলেন, হাতি ডেকে রথ টানতে বললেন। হাতি ডাঙ্গসের বাড়ি খেয়ে খেয়ে চটে উঠল, রথ এক পাও এগোলো না।এই মুহূর্তে টিমলাঞ্চ সেরে চৈতন্যদেব উপস্থিত হলেন।
তিনি এসে হাতি ষষ্ঠিচরণ যে যে জুটেছিল সবাইকে সরিয়ে দিলেন, তারপরে মাথা দিয়ে রথ ঠেলতে লাগলেন। কান টানলে মাথা আসে। আর তেমন তেমন মাথা পেলে রথ আপনি টানে। গড়গড় করে রথ চলতে লাগলো। নীলাচল হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।
আমাদের মাহেশে এতটা রোমাঞ্চকর ঘটনা রথ নিয়ে হয়তো নেই। ধ্রুবানন্দ জগন্নাথদেবের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করলেও মাহেশের প্রবাদপ্রতিম যে রথযাত্রা উৎসব, তা চালু হয়েছিল চৈতন্যদেবেরই তত্ত্বাবধানে। তাহলে মাহেশের ওই বিখ্যাত রথ? সেও চৈতন্যদেব আনলেন?
ধীরে বন্ধু ধীরে। ও আসতে লাগবে আরও দুশো বছর। সিপাহী বিদ্রোহের পর। রাজা রাজড়াদের চরিত্র বদলের ক্রান্তিকাল তখন। হুগলির ধনী বাঙালি তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ান কৃষ্ণরাম বসু। তিনি প্রথমে পাঁচ পরে নয় চূড়ার কাঠের রথ বানিয়ে দিলেন মাহেশের জন্য। এর প্রায় দেড়শো বছর পরে ১৮৮৪ সালে রথযাত্রার দিন কাঠের রথ আগুনে পুড়ে যায়। তখন বসু পরিবার নগদ কুড়ি লক্ষ টাকা দিয়ে মার্টিন বার্ন কোম্পানি থেকে বানিয়ে আনলেন পঞ্চাশ ফুট উঁচু চারতলা লোহার রথ। যা এখনও রথের মেলার ইউএসপি। তাহলে বোঝাই যাচ্ছে অন্তত পক্ষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমল থেকে মাহেশের রথ দেখতে সারা দেশ থেকে মানুষ ছুটে আসবেন। মানুষ এলে তবেই না একমাসের রথের মেলাটিও হবে?
এখানকার পানের বরজগুলো তো আর ফেলনা নয়? দেবতাকে জায়গার ভালো জিনিসটা দিতে হয়। এখন সবাই মিলে পান দিতে চাইলে কিছু একটা জড়িয়ে দিতে হয়। রথ অবধি নইলে পৌঁছাবে কেন? কলায় পান জড়িয়ে দিলেই হয়? সেই থেকে বাঙালি রথ দেখতে গিয়ে কলা বেচার পার্টটাইম ব্যবসা করে আসছে, এ আজকের কথা তো নয়! আর রথের মেলা বসলে নীলাচল হোক কি শ্রীরামপুর, খাজা তো থাকতেই হবে। খাজা জিনিসটিও তো আজকের নয় কিনা! খাজার প্রাচীনতম উল্লেখ আসছে যেখান থেকে তা নীলাচল নয় কিন্তু।
মগধ, ষোড়শ মহাজনপদের অশ্বমেধের ঘোড়া যেখানে নতুন দৌড় আরম্ভ করেছিল, সেই মগধেই নাকি এক ভিক্ষু, মাধুকরীর পথে খাজা খেয়ে প্রীত হয়েছিলেন।
আড়াই হাজার বছর আগের ঘটনা। যেহেতু ভিক্ষু ছিলেন তথাগত স্বয়ং, তাঁর প্রীতির কথা লেখা হয়ে গিয়েছে নালন্দার পুথিতে। এর বহু পরে হিউয়েন সাংয়ের মতন গম্ভীর ঐতিহাসিকও খাজা খেয়ে লিখে যাবেন “বাকলাভার মতন মিঠাই খেলাম, খর্জরিকা।তবে এ বস্তু আকারে বহরে আরও বড়”। তারও নশো বছর পর চৈতন্যদেবের রোজকার মেনুতে খাজা থাকবেই। আজও দীপুদা-প্রিয় বাঙালি পুরী থেকে ফেরার সময় হাতে খাজার প্যাকেট কখানা ব্যাগে ভরে আনবে। এমন বস্তু যা কিনলেও দিয়ে থুয়ে খেতে হয়।
আমরা তাহলে পাক প্রণালী বেয়ে একবার দেখব নাকি খর্জরিকা কেমন করে পাক দিতে হয়?
খর্জরিকা|
উপকরণ লাগবে ময়দা আর ঘি সম পরিমাণ।
কিন্তু ময়দা এলো কোথা থেকে? না মানে মৌর্য্য যুগ যদি ছেড়েও দিই, আমাদের চৈতন্যদেব ধরুন মহাপ্রসাদ মুখে দিচ্ছেন, তখন হল ষোড়শ শতাব্দী। ময়দার মতো প্রসেসড ফুড তখন আসবে কোথা থেকে?
আসলে এখনকার ময়দা আর তখনকার ময়দা এক নয়। পঞ্চানন রায় চৌধুরী সোজা বলছেন খাজা বানাতে খাসা মাস্ট।
সুজি ভেঙে তৈরি হয় খাসা। সহজপাচ্য, আবার ভাজার জন্য মুচমুচেও বটে। তবে কিনা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আসার পর থেকে মিলের তৈরি প্রসেসড খাবার আমাদের হেশেলে ঢুকে পড়ছে। তাই খাসার অবর্তমানে ময়দা চলবে, যদিও পঞ্চানন বাবু জানাচ্ছেন ভালো ময়দা খুব পাতলা সুতির কাপড়ে ছেঁকে নিতে হবে। তখনও রিফাইনড আটা অতটাও রিফাইনড ছিলো না কিনা। তারপরে এক পোয়া ময়দায় আধ পোয়া ঘি ময়ান দিয়ে খুবসে ঠাসতে হবে। জল পরিমাণ মত হবে।
যাদের মাত্রা জ্ঞান কম তারা এখানেই থেমে যাবেন, কারণ শুধু জল নয়, এর পরে যা যা হাতের কাজ আছে, তা দক্ষ কারিগর ছাড়া নামানো বেজায় কঠিন। তাই সাধু সাবধান।
পঞ্চানন রায় চৌধুরীর সাবধান বাণী মাথায় রেখেই এবারে কাঠের পাটায় ময়দা খুব পাতলা করে বেলে নিতে হবে। এরপরে ঘি দিয়ে দু ভাঁজ করে উল্টে নিয়ে আবার বেলতে হবে, তারপর আবার ঘি দিয়ে ভাঁজ করে উল্টে নিতে হবে। যতবার করা হবে তত খাজার ভাঁজ ভালো হবে। এরপর লেচি কেটে লুচির মতন বেলে বাকি ঘি তে ডুবিয়ে ভেজে নিতে হবে। যেই লেচির ভাজগুলো খুলে আসবে বুঝে নিতে হবে ভাজা শেষ। এবারে খাজাগুলো একটা চুবড়িতে রেখে ভেতরের ঘি ঝরিয়ে নেওয়াটাই দস্তুর। শেষে মোটা চিনির রস ঝাঝরি করে খাজার ওপর ছড়িয়ে দিলে কেল্লা ফতে।
তবে দময়ন্তী দেবী যেমন বছরখানেকের রসদ হিসেবে রাঘবের ঝালিতে শুকনো মিষ্টি পাঠাতেন মহাপ্রভুর জন্য তেমনটি বানাতে চাইলে চিনির শিরা ছাড়া খাজা শুকনো রাখাই শ্রেয়। দময়ন্তী দেবীর অবশ্য ভাবনা ছিলো না। পেনেটি থেকে নীলাচল অবধি শুকনো খাজা পৌঁছে গেলে সেসব খাদ্য আপনিই ভক্তিরসে জারিত হয়ে যেত, চৈতন্যলীলার সেসব কথা কে না জানে? আপনি একটু কষ্ট করে চিবিয়েই খেলেন না হয়! আর অবশ্যই বিলি করে খেতে ভুলবেন না!
খাদ্যের সুষম বন্টনেই মঙ্গল।
প্রকৃত রসমঙ্গল।
ধাঁধা
সুন্দর বরণ তার কুন্ডল চরণ
যশোদা দেবকী নয় গর্ভে নারায়ণ