ভূমিকা
সাদিক হোসেন, সাকিন মুর্শিদাবাদ
অনামিকা মিত্র, সাকিন উত্তর কলকাতা
রাজযোটক যে নয় সাদিক-অনামিকা তা জানতে কোষ্ঠীবিচার লাগবে না। দুর্গ্রহলগ্নে ওদের জন্ম। তাই তো নেট পরীক্ষা দিতে গিয়ে পাশাপাশি সিট পড়ে। সময় বুঝে কালি খতম হয়ে যায় সাদিকের। ঝট করে পেন বাড়িয়ে দেয় পাশ থেকে অচেনা অনামিকা। ডটপেনের মূল্যবাবদ পরীক্ষার পরের চা আর প্রজাপতি বিস্কুটটা অফার করে সাদিক। তারপর? অনামিকার গালে টোল পড়ে, সাদিকের গিটারে বোল ধরে, কাশফুলে লাগে দোল। যা হবার তাই হয়। অথচ তখন সদ্য নয়ের দশক। বাবরি মসজিদ অক্ষত। ভাবা যায়?
সাদিক অনামিকার প্রেমটা বেশিদিন টেকেনি। কিন্তু টেঁকসই প্রেম ঠিক কেমন? এই যে প্রতি পুজোয় এরা এখনও একজন আরেকজনকে মনে করে চিঠি লেখে, লিখে সে চিঠি রেখে দেয় যার যার ডায়রিতে, এটা প্রেম, না অন্য কিছু? এই চিঠি আর কিছু গান কবিতা নিয়ে শ্রুতিনাটক শরতের খোলা খাম। কিছু চিঠি থাকল এখানে আপনাদের জন্য।
নির্বাচিত চিত্রনাট্য
সাদিক: চিঠি - এক
অনামিকা,
এই প্রথম দুর্গাষষ্ঠী, তোমাকে ছাড়া। ক'টা ষষ্ঠীই বা পেয়েছি আমরা! ক'টা ঈদ পেয়েছি, বল? আমি সেই পেনটা দিয়ে লিখছি এখন। সেই পেন, তুমি দিয়েছিলে নেট পরীক্ষার সময়। যত্ন করে রেখে দিয়েছি। ওর নাম রেখেছি আংটি। অনামিকার আংটি। কেমন, বেশ নাম, না?
এখন সবে সূর্য উঠি উঠি করছে। ঈদের সময় রোদটা বড় তীব্র হয়। একটু বেশি ঝলমলে। তুমি থাকলে কাজে দিত, তোমাকে দেখতে পেতুম দু চোখ ভরে। কিন্তু, কিন্তু, এখন এত আলো নিয়ে কি করব আমি বলতে পার?
ভাগ্যিস এ চিঠি তোমার বাড়ি পৌঁছাবে না। নৈলে এতক্ষণে তুমি হেসেই কুটোপাটি হতে। বেশি হাসলে তোমার চিবুকে, গালে লালচে আভা ধরে। এখনও ধরে? অনামিকা, আমাকে মনে পড়ে?
কেমন পাগলের মত বকছি। দিদির কথা বড্ড মনে পড়ছে। বলিনি তোমাকে বোধহয়, আমার একটা দিদি ছিল, সাবিনা। পিঠোপিঠি। পুজোর সময় ভোরবেলায় ওর গায়ের গন্ধ পাই ,জান? বিয়েবাড়ির বাসী খাবার লুকিয়ে চেয়ে খেয়েছিলাম আমরা। দুদিনের ভেদবমিতে চলে গেল দিদিটা। আমার কিচ্ছু হল না।
পুজোর ভোরে শিউলি কুড়োতে নিয়ে যেত আমাকে। হিঁদুপাড়ার দেখাদেখি শিউলির বোঁটা দিয়ে কোরা কাপড় ছাপাত। পাগলী দিদিটা আমার।
ছেলেবেলাই ভালো ছিল, বুঝলে? অনামিকা?
অনামিকা: চিঠি দুই
সাদিক,
এ চিঠি আমার আকাশ এর ঠিকানায়। প্রয়োজন ছিল না ঠিকানা নেওয়ার। আকাশ বাতাস জানান দিচ্ছে শরৎ এসেছে। শরৎ এর আগমন বার্তা মনে করিয়ে দেয় তোমার সাথে প্রথম পুজো কাটানোর কথা। মনে আছে তোমার, সেইবার হেঁটে হেঁটে আমার পায়ে ফোস্কা। তখন কত টাকাই বা ছিল? তুমি বললে রিক্সা করে আমায় পৌঁছে দেবে। আমার মানা শুনলেই না! তুমি খুব আনন্দ পেতে পুজোর কলকাতাকে। আর আমার আড়ম্বর কোন কালেই পছন্দ নয়। তাও তোমার সঙ্গ পাবার লোভ!!! আজ ভাবি আর মজাই লাগে।
তবে আমার ছোটবেলার পুজোর স্মৃতি কিন্তু দেশের বাড়িতে। বাবা যদ্দিন ছিলেন হল্লা করেই কাটত। জ্ঞাতি ভাই বোনেরা আসত। সারাদিন শুধুই দস্যিপনা, মায়ের বকুনি নেই। বড় সুন্দর ছিল দিন গুলো।
বিনামেঘে বজ্রপাতে বাবার চলে যাওয়া। পুজোগুলো ধূসর হয়ে গেল, জানো? দেশের বাড়ি যেতেই চাইতাম না। জেঠু জোর করে নিয়ে যেতেন। চুপচাপ এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াতাম। ভোরে উঠে দেখতাম উঠোনের ঘাস এর উপর শিশির জমেছে। হাত বুলিয়ে চোখে লাগাতাম সেই শিশির। তাতে কান্না থাকত মিশে। শিউলির গন্ধে ঘুম আসত না।
আজও পুজোর আয়োজন হয়। ষষ্ঠীতে দেবীর বোধন হয়। তবুও মনটা ছোটবেলার সেই আনন্দের দিন গুলোর জন্য আকুল হয়। যদি আর কখনও ফিরে আসত দিনগুলো!
সাদিক: চিঠি-তিন
অনামিকা,
চাকরি, বাকরি আমার দ্বারা আর হল না, বুঝলে? আম্মু বলেছিল গোস্তের দোকান দিতে, তাও দিইনি অপদার্থ কুলাঙ্গার আমি, বুঝলে অনামিকা?
নাকি, সুপর্ণা বলে ডাকব তোমায়? দুর্গাপুজোর এমন এক বিকেলে প্রোপোজ করেছিলে তুমি, আমি তখন মনে মনে তোমাকে সুপর্ণা বলে ডেকেছিলাম। এমনিই, ইচ্ছে হয়েছিল, তাই। শুনলে অবাক হতে, সুপর্ণা?
মেটিয়াবুরুজে এসেছি, সেলাইয়ের নমুনা নিয়ে। সূঁচসুতো আমার কম্ম নয়, আমার এক খালা জুটেছে, তার এতিম মেয়েদের আশ্রমের দেখাশুনো করি। ক্ষয়াটে আঙুলে রোগাসোগা মেয়েগুলো কত কী নকশা তোলে। ওদের বেশির ভাগই ঠকানো বিয়ে করে বেচাকেনার হাট ঘুরে আসা। খালা কোথা থেকে কীভাবে নিয়ে আসে ওদের।
ওদের বাপের বাড়ি ফেরা হয় না। তুমি শুনলে অবাক হতে, সুপর্ণা?
অনামিকা - চিঠি চার
সাদিক,
ভাগ্যক্রমে চাকরিটা হয়েই গেল। ভাগ্যদেবী প্রসন্ন ছিলেন বোধ করি। না কি ভেবেছিলেন, অনেক তো হল, এ বেচারাকে এবার তো একটু স্বস্তি দিই!
জানো, বাবার চলে যাওয়ার পর মাকে দেখেছি, কত কষ্ট করতে। কোনো কোনোদিন একবেলা খাবার এর যোগাড় হত। কিন্তু পড়াশোনার জন্য কোনো অভাব রাখেন নি। শুধু বলতেন, 'তোকে কিছু একটা করতেই হবে , মামণি'।
আর তাই বোধ হয় কোনোদিন বসন্ত আসেনি আমার কাছে। আর যখন এল--- আমি ভাসতে ভাসতে এতদূর চলে গেলাম, কূল কিনারা পেলাম না।
কি পাগলামি! মনে আছে তোমার? নবমীর ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে….. হাতটা ধরে বলেছিলাম, “আমি তোমার প্রেমে পড়েছি!” তোমার তখন কি জোর বিষম লাগল! আমি হেসে উঠেছিলাম। কি ছিল তোমার শান্ত চোখ দুটোয় সেদিন? আমি যে সত্যি বলেছিলাম, সেটাই কি তুমি বোঝো নি? না কি না বোঝার ভান করেছিলে?
সাদিক: চিঠি পাঁচ
ও সুপর্ণা,
বিয়ে করেছ? করেছ তো? তাই তো তোমার কথা শুনে মাথা নেড়ে বলেছিলাম তোমার মা ভুল কিছু বলেননি, হিন্দু মুসলিম বিয়ে হয় না। যাতে তোমার ঘর হয়। তাই তো বলিনি, তোমার তুতো দাদারা আমাকে রাস্তায় ফেলে শাসিয়েছিল। যাতে তোমার বর হয়। বলিনি, সুপর্ণা। তুমি অনামিকা হয়েই থাক। সুপর্ণা থাক শুধু আমার?
অনামিকা : চিঠি ছয়
সাদিক,
প্রেমের কথা শুনেই তোমার শান্ত চোখ দুটি তে উঠেছিল ঢেউ। মনের ভেতর কি চলছিল তখন তোমার? কোনদিন বলনি। হঠাৎই খবর পেলাম না তোমার। কোথায় চলে গেলে?
সে বছর আমার বিয়ের জন্য প্রস্তাব এল। বাবার বন্ধুর ছেলে। আমাকে তাদের পছন্দ। আমি না করলাম। আমি তো তোমাকেই হৃদয়ে রেখেছিলাম, অন্য কাউকে মেনে নেওয়ার কথা আমি ভাবতেই পারিনি।মাকে তোমার আমার সম্পর্ক নিয়ে বললাম। মা প্রচন্ড রাগ করলেন। বাড়িতে কথাবার্তা বন্ধ। মা এর বক্তব্য একটাই- এ বিয়ে হতে পারে না। তবুও মাকে ছেড়ে থাকতে পারিনি। তোমার মনের খবর জানার চেষ্টাও করেছিলাম। খবর পাই নি।
সেই প্রথম, শুভ বিজয়া বললেই না আমাকে। চলেই গেলে। থাক, অভিমান অভিযোগ নাই করলাম। আজ রাত পোহালে কাল আরেকটা দশমী। তুমি যেখানেই থাক সাদিক, মা দুর্গা তোমাকে ভালো রাখুন।
অনামিকা : চিঠি সাত
কোথায় চলে গেলে তুমি সাদিক? জানো? তোমার দমদমের মেসের ঠিকানায় খোঁজ নিতে গিয়েছিলাম? তোমার রুমমেটরা কেমন করে তাকিয়ে বলল তুমি আর কখনও কলকাতায় ফিরবে না। আমি অবাক হলাম। খুব অভিমান হয়েছিল। কষ্ট হয়েছিল। কিন্তু বিশ্বাস করো, জানতামই না আমার মা জেঠুর ছেলেদের পাঠিয়েছিলেন তোমাকে ভয় দেখানোর জন্য। যখন জানলাম…. টু লেট …
কীসের অভিমান তোমার? কীসের ভয়? জোর করতে শিখলেই না? বুকের ভেতর এত কষ্ট চেপে রাখলে কী করে? সাদিক? একবার ও তো আমার অনুভূতির কথা ভাবতে পারতে? সত্যিই কি জানতে পারবে তুমি কোনদিন? আমিও কি জানাতে পারব তোমায় কখনও?
সাদিক: চিঠি আট
অনামিকা,
পরীখালার এতিমখানাটা বেশ বড় হয়েছে। বাইরে থেকেও মেয়েরা আসে কাজ শিখতে। কেউ হিন্দু, কেউ মুসলিম। পুজোর সময় নিঃশ্বাস ফেলার ফুরসত থাকে না। তার ওপর এই বৃষ্টি, ঘরদোর ভেসে তো গেছেই, খাবার জোটানোই ভার। তারমধ্যে পার্টির লোক এসে হুজ্জুতি, বলে আমরা মেয়ে পাচার করি। পরীখালার কানেকশন ছিল বলে প্রাণে বেঁচে গেছি। যারা রড, তরোয়াল নিয়ে এসেছিল তারা তোমার তুতো দাদার মত দুধভাত নয়। হাতে চোট, কলম ধরতেই পারলাম না, দেখ দশমী এসে গেল। কিন্তু না লিখলে মস্ত গুণাহ হয়ে যায়, তাই ফোনেই লিখছি।
কেমন আছ? অল্প অল্প নুনমরিচের রং ধরেছে চুলে? খোকাখুকু ক'টি? সামনে গিয়ে যদি দাঁড়াই? অবশ্য তোমাকে বিশ্বাস নেই, হয়ত খপ করে আমার হাত ধরে নিজের ছেলেমেয়েদের বলবে এই দেখ আমার পুরোনো আশিক সাদিক, তোদের সাদিকচাচা। তাই তো যাই না। অবশ্য যাব কোথায়? তোমার ঠিকানা গুম করেছি, স্বেচ্ছায়।
অনামিকা? শুভ বিজয়া। মিষ্টি খাওয়াবে না?
অনামিকা: চিঠি নয়
সাদিক,
পুজো আসে, পুজো যায়। প্রতি পুজোর শেষে শুভবিজয়ার চিঠি আর মিষ্টি- এইতো চলে আসছে।আজও তোমার অজানা ঠিকানায় চিঠি লিখে চলেছি।
বয়স বেড়ে চলছে, জানো? মাঝে মাঝেই শরীর বলে পড়ন্তবেলায়, ওরে থাম। চুলের রং জানান দেয়- কিন্তু মন মানে না। সে খালি ওই স্বপ্নালু রঙিন দিন গুলোকেই ফিরে ফিরে দেখতে চায়।
সেই, সেই বছর, মনে আছে , একসাথে ইছামতীর দুর্গা বিসর্জন! দুই দেশের একত্র সমাবেশ।
কিন্তু , তোমাকে আর আমাকে- ধর্মই আলাদা করে দিল, সাদিক। আর এক হতেই দিল না! কে দায়ী? কেন? জানি না। জানতে চাই না। বলতে পারো? এই বিভেদরেখা কেন?
আচ্ছা, আজকাল শুনছি দেশ নাকি ধর্ম এর ভিত্তিতে আলাদা হবে? নাম নথিভুক্ত হচ্ছে?
তুমি কোথায় থাকবে? আর আমি? আমি কোথায় যাব ? সাদিক?