ভাষ্য
রবিহারা দিনগুলোতে গা ম্যাজম্যাজ নাক ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ? এই ওয়েদারে গরম গরম ধোঁয়া ওঠা এক থালা খিচুড়ির আগ্নেয় পাহাড়, তার জ্বালামুখ থেকে গড়িয়ে পড়ছে টলটলে ঘিয়ের স্রোত। জিভ, পেট, মন, শরীর উষ্ণ রাখতে আজ পাতে পড়বে কী? কেন? খিচুড়ি? শীতের কনকনে রাতে বর্ষার ঝমঝমে দুপুরে ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ি খেলে শরীর ওম পায়। হাই ফাইবার হাই ক্যালোরি এইসব খাবার হজম করতে করতে একটু মঙ্গলকাব্যে শুনুন। অষ্টাদশ শতকে কবি ভারতচন্দ্র লিখছেন অন্নদামঙ্গলে-
"পিঠা হৈল পরে পরমান্ন আরম্ভিলা।
চালু চিনা ভুরা রাজবর চালু দিলা।।
পরমান্ন পরে খেচরান্ন রান্ধে আর।
বিষ্ণুভোগ রান্ধিলা রান্ধুনী লক্ষ্মী যার।।"
খেচরান্ন যে খিচুড়ি সে কি আর বলবার অপেক্ষা রাখে?
বর্ষার ভিজে দিনকালে খিচুড়ি, পাপড়ভাজা আর মামলেট। আহা, রসের সমদ্দুর! ভদ্রজনেরা স্বাস্থ্য রাখতে এক প্রস্থ চাল, এক প্রস্থ ডাল, যত্সামান্য লবণ আর পরিমাণ মতো ঘি পাক করিয়া পরিপাক করেন। ডায়েট চার্ট নিয়ে বকাবকি করতে আসবেন না, এই রেসিপি স্বয়ং চাণক্যের। তাহলে ভাবুন, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্য দু বেলা খিচুড়ি খেয়ে আলেকজান্ডারকে অবধি মাত দিয়ে দিলেন? মিশর ফেরত গ্রিক সম্রাটের নামে যে খিচুড়ি পদ আছে আলেকজান্দ্রিয়ান কোশারী, সেটা আবার ইজিপ্টের জাতীয় খাদ্য কোশারীর থেকে রেসিপিতে অনেক আলাদা। চালে মুগের ডালে জিরে ফোড়ন দেওয়া টলটলে আলেজান্ড্রিয়ান কোশারী, সে খিচুড়ির তুতো বোন বটে।
তবে? খিচুড়ি কি সামান্য জিনিস? নিম্নচাপের মেঘ দেখে দৌড়ে চালে ডালে বসিয়ে দেওয়ার ফাঁকে এই আপামর জনতার প্রিয় খাদ্যটির ইতিহাস ভূগোল একটু জেনে নিলে ক্ষতি কী?
সেই কবে চাণক্য দেশবাসীকে খিচুড়ি খেয়ে স্বাস্থ্য ফেরাতে বলেছিলেন। চাল ডালের ক্ষেতেই হয়ত জনৈক খাদ্যরসিক বা রসিকা লিখে ফেলেছিলেন গব্যঘৃতসহযোগে তামাম হিন্দুস্তানের রসনার ভোগ রেসিপি, হতেই পারে সেসব প্রথম বুদ্ধপূর্ণিমারও আগের ঘটনা। চাল ডালের মিতালি সেই কন্যাকুমারিকা থেকে পোঙ্গল মানে তামিলনাড়ু, বিসি বেলে ভাত মানে কর্ণাটক, কিমা খিচুড়ি বা খিচড়া মানে হায়দরাবাদ ইত্যাদি স্বাক্ষর রেখে বিন্ধ্য ডিঙিয়ে হইহই করে ছড়িয়ে পড়েছে পুব থেকে উত্তর থেকে পশ্চিমে। যত পুবের সুজলা সুফলা গঙ্গামাটির দিকে এসেছে, খিচুড়িতে তত চেকনাই বেড়েছে।
একটানা বর্ষায় দুকূল ভেসে গেলে বাদলা হাওয়া গায়ে লাগিয়ে কে আর ভাত তরকারী রাঁধে?
“আজ তাহলে চালে ডালে বসিয়ে দিই?” - বাদলা দিনের সিগনেচার ডায়ালগ। চালে ডালে আবার কত রকম? সে গুনতির শেষ আছে? আয়ুর্বেদশাস্ত্র চরকসংহিতা অবধি তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। মাষকলাই, তিল, দুধ ও মুগডালের সঙ্গে অন্ন পাক করাটা বলকারক, তৃপ্তিকর, পুষ্টিকর। মাংসবিশিষ্ট পলান্ন বা পোলাওয়ের সমতুল্য, শাস্ত্রেই বলেছে। মানে খাদ্যগুণের চোটে নিরিমিষ খিচুড়ি হলো মাংসের সমান!
যা ছিল কোনও কালে মহাজনপদের কমিউনিটি লাঞ্চের প্রথা তাই এখন ত্রাণের খাদ্য। বন্যা, যুদ্ধ, ভূমিকম্প বিপর্যস্ত এলাকায় উনুন ধরানোর উপায় থাকলে লঙ্গরে প্রথম খাবার যেটি চড়ে তা হল খিচুড়ি।
ভোগের খিচুড়ি আবার যেমন, সুগন্ধী আতপ চাল আর সোনা মুগের ডাল মাস্ট। দেব দেবীর খাওয়া হলে নরনারায়ণ পাত পেড়ে খেয়ে যান খিচুড়ি, সঙ্গে আলুর দম কিংবা লাবড়া।
মনসামঙ্গল সাক্ষী, “আদা কাসন্দা দিয়া করিবা খিচুড়ি” শুনে স্বয়ং মহাদেবও চঞ্চল হয়ে উঠবেন। খিচুড়ি এমনই দেবভোগ্য। তবে কিনা নিরামিষ।
বাঙালি অভিধানে তো পেঁয়াজ রসুন মায় মুসুর ডালও আমিষ, তাই বলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মহতী রসনা পেঁয়াজ রসুনে ক্ষান্ত হবেন এমন ধারা কেচ্ছা কেই বা করবেন! খিচুড়ির মধ্যে ডাল বস্তুটির বদলে মাছপোড়া ঢুকিয়ে বিলিতি রসিকজন খিচুড়ি রেসিপি ক্র্যাক করলেন। কিভাবে ? সে হিসেবে নাই গেলাম, তবে বিলিতি হেঁসেলে তাঁরা কালা আদমির খিচুড়িকে কেজরি বলে আদরযত্নে তুলেছেন, এই বা কম কথা কী?
দিশি খিচুড়ির কী হবে তাহলে? ওই নিরামিষ খিচুড়িই কি নোলায় থেকে যাবে? মোগলাই খিচুড়ি আছে তো? কিন্তু হায় মোগল, তোমার সিলেবাস ও খিচুড়ি দুইই গিয়াছে। সম্রাট আকবর একাহারী ছিলেন তা যদিও বা জানি, তিনি যে নিরামিষ খিচুড়ির ভক্ত ছিলেন তা জানে কয়জনা? আবুল ফজল রেসিপি দিয়েছেন সমপরিমান চাল, ডাল আর ঘি দিয়ে রান্না খিচুড়ি সম্রাট ও সেনা দুয়েই পেট ভরে খায়, কেমন?
আর বাদশা জাহাঙ্গির? মুখ বদলাতে হলে কী খেতেন? বাদাম আর মশল্লা দিয়ে রাঁধা নিরামিষ খিচুড়ি লাজ়িজ়ান। গুজরাতি খিচুড়ি। তৃপ্তি করে খেতেন বলে শোনা যায়! এদিকে বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায়ের পাক-প্রণালী’তে জাহাঙ্গিরি খিচুড়ির রেসিপি দেখুন। চাল ডাল যা তার ডবল মাংস। যতটা চাল, ততটা ডাল। সঙ্গে পরিমাণে দ্বিগুণ মাংস। ঘি আর পেঁয়াজের রস লাগবে মাংসের সমান। এক কিলো মাংস হলে এক কিলো পেঁয়াজ আর এক কিলো ঘি। ভালো করে মাংসটা কিমা বানিয়ে পেঁয়াজের রস, আর আদার রস মাখাতে হবে। এক কিলো মাংসে তিরিশ গ্রাম আদার রস, হয়েছে? ইয়ে, ধনে বাটা লাগবে আদার অর্ধেক পরিমাণ, আর লাগবে নুন। সব মিলিয়ে ম্যারিনেশনে রাখতে হবে এক ঘণ্টা। চাল আর ডাল ভালো করে ঘিয়ে ভেজে তার মধ্যে মাংস, ছোট এলাচ গুড়ো, দারচিনি গুড়ো, আর গোলমরিচ গুড়ো দিয়ে বেশ করে জ্বাল দিতে হবে, কম আঁচে।রান্নায় জল পড়বে না। মাংসের সমান পেঁয়াজের রস পড়েছে মনে নেই? সব কষিয়ে নিয়ে মাংসের গ্রেভি শুকিয়ে এলে কড়ার ঢাকাটা ভিজে কাপড় দিয়ে জড়িয়ে ওপরে একটা ছোট বাসনে জ্বলন্ত কয়লা রেখে দম দিতে হবে। দম শেষ হলেই ঘি ছড়িয়ে উনুন নিভিয়ে দেবেন। মোগলাই খানার সুগন্ধ এসে অনুলোম বিলোমে ধাক্কা মারলেই জাহাঙ্গীরি খেচোরান্ন রেডি টু সার্ভ। বাদশাভোগই বটে। এদিকে জাহাঙ্গীর নিজে খেতেন নিরামিষ খিচুড়ি। শ্রীহরি শ্রীহরি।
যাক গে, চলুন তাহলে যাই আমিষ খিচুড়ির দুয়ারে। ভুনা খিচুড়ি আর মাংসের কম্বো প্রথম জেনেছি লীলা মজুমদারের লেখায়, ঝমঝমে বৃষ্টির ছমছমে রাতে ডিনারের মেনু ছিল এই অমৃত। সেই পাঠের সোয়াদ এখনও জিভে লেগে আছে বরাবর। খিচুড়ি দিয়ে ডিমের ঝোল আবার একটা মস্ত ব্যাপার। মোটের ওপরে আমিষ খিচুড়ি মানেই ঘি গরম মশলা কিমা মাংস দিয়ে ভুনা খিচুড়ি আর মামলেট, পেঁয়াজি, বেগুনী ইত্যাদি অনুপান। খাদ্য খাদকের রকমফের ।
এইবারে খিচুড়ির সঙ্গে ইলিশের কথাটা না উঠলে কিন্তু বর্ষা অভিমানে উষ্ণায়নের সঙ্গে ইলোপ করতে পারে। বাজারে মেলাই রূপোলী শস্য, শ্রাবণধারায় ভিজে ভিজে মাছ কিনতে নইলে যাওয়া কেন বাপু? ইলিশ এদিকে খিচুড়ির সঙ্গে ভাজা। আর ভাতের পাতে? রসরাজ অমৃতলাল বসু বলেছেন
‘পাড়াতে কড়াতে কেহ মাছ ভাজে রাতে।
রন্ধনে আনন্দ বাড়ে গন্ধে মন মাতে।
লাউপাতা সাথে ভাতে সর্ষেবাটা মাখা।
সেই বোঝে মজা তার যার আছে চাখা।"
জল যদি হয় রূপোলী পর্দা, তবে তার অবিসংবাদী মহানায়িকা হবেন ইলিশ। রীল এবং রিচের দৌড়ে ইলিশের খবর এখনও হাওয়ার আগে ছোটে। ধারে এবং ভারে কাটে। তারপরে আছে কুল গোত্র নিয়ে পুছতাছ যাচ পারতাল। ডিম্ না তেল? খোকা না বড়? ইলিশ ঘটি, না বাঙাল?
ইলিশ হলো বাঙালির তাতে সন্দেহ নেই। তাই বলে গঙ্গার ইলিশের ঘ্রাণ বনাম পদ্মার ইলিশের তেল প্রতিযোগিতা তো আর ভোলা যায় না? অনেক রসিক আছেন যাঁরা ভাগীরথীর ইলিশকে ওই ঘটিই ধরেন, যেমন পদ্মার ইলিশ কারোর কারোর কাছে বাঙাল ইলিশ। যদিও এখন রূপোলী ইলিশ সোনার চেয়েও দামি, ওজন কেজি না হয়ে ভরি কিংবা রতিতে হওয়া উচিত। তাই তো ছড়ায় এবং ছবিতে ইলিশে একটা কিন্তু থেকে যায়। এই যে সর্ষের তেলে ভেসে থাকা নধর পিসটা দেখে আপনি দশবার কোঁত করে নোলা সামলাচ্ছেন, ওটা দেখে এক গ্লাস জল খেয়ে একটু বাজারটা টহল দিয়ে আসুন। ইদানিং নিলাম ডাকার মত দরাদরি চলছে বালিশের মত মোটা ইলিশ নিয়ে, তার গায়ে মেমসাহেবের মত গোলাপী আভা। রসিক লোকেরা বিলক্ষণ জানেন এইসব মডেল আসলে মহানায়িকার স্টান্টলেডি, বোম্বে গুজরাত উপকূল থেকে আরব সাগরের জল খেয়ে আসা ইলিশ, মানে গোত্রে কিঞ্চিৎ ঘেসো স্বাদের। তা সে ইলিশ মানেই গঙ্গা পদ্মা মেঘনার তো নয় কিনা, বাঙালীর রসশাস্ত্রের কথাই ধরুন। অন্নদামঙ্গলে রায়গুণাকর পাঙাশ ইলিশের কথা অবধি বলে গিয়েছেন। খয়রা ইলিশ আর খোকা ইলিশের তফাত করতে পারেন কয়জনা? ইলিশ বিলে গিয়ে ঢুকলে নাম হয় বিলিশ। তার টেস্ট কিন্তু নদীতেই থেকে যায় খানিক, বিলিশ আবার ইলিশ কূলে কুলীন নয়, অনেকটা কালাপানি পেরোনোর মতন ঘটনা আর কি। আসুন ঢাকা ফরিদপুরের গান শুনি
ইলশ্যা মাছ উইঠয়া বলে
আমার সুন্দর কুল রে আমার সুন্দর কুল
আমারে খাইতে বানাও কাঁচা মরিচের ঝুল
কবি বুদ্ধদেব বসু লিখেছেন
রাত্রিশেষে গোয়ালন্দে অন্ধকালো, মালগাড়ি ভরে
জলের উজ্জ্বল শষ্য- ..
বন্ধুর পাঠানো ইলিশ খেয়ে কবি লিখতে বসেছিলেন কিনা জানা নেই, পদ্মার ইলিশের তেলে কলম হড়কে যাচ্ছে এ কথা তিনি বলেছেন অবশ্যই। তখন কবি কি জানতেন, এই গোয়ালন্দে পদ্মা মজে আসবে একদিন? ইলিশ হবে অপ্রতুল?
তা খিচুড়ির সঙ্গে ইলিশমাছ ভাজা হলো? বৃষ্টি? ইলশেগুড়ি?
তাহলে একটু ভূতের গল্পও হোক? নাকি?
এখন লোকজনের ভিড়ে ঠাসাঠাসি হয়ে ভূত ব্যাপারটা একটু আধ্যাত্মিক গোছের হয়ে গিয়েছে। সেকালে কিন্তু জলজ্যান্ত ভূত দেখার ঘটনা ঘটত হামেহাল। আলাদা করে বানিয়ে গল্প বলার দরকার পড়ত না। তখন কিশোরগঞ্জের এক নম্বর ডাক্তার ভুবনকৃষ্ণ ভট্টাচার্য। বংশ পরম্পরায় কবিরাজ বাড়ির ছেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ দিয়ে ময়মনসিংহে ফিরেছেন। দূর দূরান্ত থেকে ডাক আসে রুগী সারানোর জন্য। ডাক্তারবাবু ধন্বন্তরী, তাঁকে দেখলে রোগ পালিয়ে যায়। হু হু করে পসার বাড়ছে। সেবার রুগী দেখে ফিরছেন বেশ দূরের এক গ্রাম থেকে। ভরা শ্রাবণ। যমের সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে রুগীকে ফিরিয়ে এনেছেন, তাই ডাক্তারবাবুর ফি বাবদ যা ছিল তার উপরি পাওনা হয়েছে জোড়া ইলিশ।
প্রসঙ্গত বলে রাখা ভাল, তখন এক টাকায় মধ্যবিত্ত মানুষের ভাসাভাসি বাজার হয়ে যেত। এখানে ইলিশের প্রসঙ্গটা একটু আলাদা। বাজার গিয়ে দরদাম করে গৌরী ইলিশ কেনার চল মোটেও ছিল না। ঘাট থেকে উৎসাহী বাজারুর দল টাটকা ইলিশ সওদা করে আনবেন, এটাই রেওয়াজ ছিল। রুগীর বাড়ির লোকজন সম্ভবত ঘাটে লোক পাঠিয়েছিলেন, ডাক্তারবাবুকে খুশী করবেন বলে।
তা ভুবনকৃষ্ণ যে খুশি হন নি বলা ভুল হবে। রুগীর ওষুধ পথ্যের ব্যবস্থা করে সাইকেলে উঠতে উঠতে বেলা যে পড়ে এল সে কি তিনি দেখেন নি? নাকি বাঁ হাতের শর্টকাট রাস্তাটির যে কিঞ্চিৎ বদনাম আছে তা তিনি জানতেন না? জোড়া ইলিশ দড়িতে ঝুলিয়ে খুশিয়াল মনে জলা জঙ্গলের শর্টকাট ধরলেন ভুবনকৃষ্ণ, তখন শ্রাবণের ঘোলা সূর্য ডোবে ডোবে। শর্টকাট ধরে মাইলটাক এগোতেই প্রথম মিউমিউ ডাকটা শুনতে পেলেন। দূরে নয়, একেবারে পায়ের কাছে। পাছে অবলা জীবটা সাইকেলে চাপা পড়ে তাই থেমে গেলেন ডাক্তারবাবু। ভালো করে খুঁজে দেখলেন। কোথাও কোনো বেড়াল নেই। তবে যে স্পষ্ট ডাক শুনলেন? ইতিউতি চেয়ে শেষ অবধি আবার প্যাডেলে ফিরলেন ভুবনকৃষ্ণ। ভরা জলা জঙ্গল সামনে। একটু পরেই ফের সেই মিউমিউ। একেবারে পায়ের কাছে। দাঁড়িয়ে পড়লেন ডাক্তারবাবু। অন্ধকারে হাত পা দেখার জো নেই। বেড়ালটা পায়ের কাছেই আছে হয়ত, গাঢ় রং বলে দেখা যাচ্ছে না। নিজেই নিজেকে বললেন তিনি।
এবার কী মনে হল, সাইকেলে ফুল স্পিডে তুলে দিলেন। সামনে একটা কালভার্ট। পায়ের কাছে মিউমিউ সমানে চলছে। কোনো বেড়াল এই গতিতে সাইকেলের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে ডাক্তারবাবুর জানা ছিল না। হঠাৎই কালভার্টের সামনে থামলেন। মিউমিউ ডাক একটুও থমকালো না, চমকালো না। বেড়ালটাকে আর খুঁজলেন না ভুবনকৃষ্ণ। এতদিন ডাক্তারির পাশাপাশি তন্ত্রচর্চা করছেন, কাদের যে অবলা প্রাণীর ভেক ধরতে হয় তা তিনি বিলক্ষণ জানেন। দ্রুত মন্ত্রপাঠ করলেন, তারপর কালভার্টে সাইকেল তুলে দিলেন। ফুলস্পীডে প্যাডেল। আবার মাইলটাক সব চুপচাপ। তারপর আবার সেই ডাক। শুধু এখন আর কাকুতি মিনতি গোছের মিউমিউ নয়। অধিকার আদায়ের গর্জন। ভুবনকৃষ্ণ না থামলেন, না ফিরে দেখলেন। কপাল ভালো সামনে একটা গ্রাম পেলেন। এই গ্রামের পরেরটায় তাঁর বাড়ী। এখানে অনেক চেনা পেশেন্ট আছে তাঁর। প্রথম বাড়িটাই তাঁর বন্ধু বদিরুদ্দিন মিঞার, যে কিনা আবার কলিকের ব্যথার পুরোনো রুগি। সাইকেল নিয়ে সোজা বদিরুদ্দিনের উঠোনে নেমে তার নাম ধরে হাঁক পাড়লেন ডাক্তারবাবু।
বদিরুদ্দিনের দাওয়ায় এসে অন্ধকার যেন খানিক তরল। উঠোনে বোঝাই করা খড়ের আঁটি। তার পাশে দশাসই চেহারার একটা লোক অন্ধকারে পাহাড়ের মত বসেছিল। ভুবনকৃষ্ণকে দেখে উঠে দাঁড়াল। এত লম্বা লোক আগে দেখেননি ডাক্তারবাবু। এ বদিরুদ্দিন নয়। বদিরুদ্দিন লম্বায় মোটে পাঁচ ফুট।
লোকটা চাপা গলায় বলল
"খুব বেঁচে গেলি আজ। তুই কথা জানিস। তাই বেঁচে গেলি। কথা জানিস।"
কথাটা ফেরত দেওয়ার আগেই কুঁড়ে থেকে বদিরুদ্দিন বেরিয়ে এল। হাতে লন্ঠন। ভর সন্ধেবেলায় জোলো হাওয়ার মধ্যে ডুবনকৃষ্ণকে দেখে অবাক হয়ে বলল,
"এই ভর সন্দেবেলা হক্কুড়ি থুইয়া আইছস? হাতে ও কী, ইলিশ তায় জোড়া? তোরে ভূতে ধরে নাই আল্লার কিরিপা রে ভুবন।"
ডাক্তারবাবু অবাক হয়ে দেখলেন তাঁর হাতে সেই জোড়া ইলিশ ধরা আছে। সাইকেল থেকে নামার সময় মাছদুটো কখন হাতে তুলেছেন নিজেও জানেন না। সেই মুশকো লোকটা ত্রিসীমানায় নেই। কোথাও চলে গেল, নাকি লুকিয়ে পড়ল? ইলিশ দুটো বদিরুদ্দিনের বাড়ির পাশের কচুবনে সটান ছুঁড়ে ফেলে দিলেন ভুবনকৃষ্ণ।
সেসব সময়ে শ্রাবণের ধারার মত রসনার তৃপ্তি ঝরে পড়ত রসবতীতে। সঙ্গে এমন ভূত দেখার গল্প। সবাই ভুবনকৃষ্ণের মত শক্ত ধাতের হতেন না, অনেকে জ্ঞান হারাতেন, অনেকে প্রাণ।
এর পনের কুড়ি বছর পর থেকে শুরু হবে এক অদৃষ্টপূর্ব সত্যি ভূতের গল্প। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের খোরাকি যোগান দিতে গিয়ে দুর্ভিক্ষে অনাহারে উজাড় হয়ে যাবে সোনার বাংলা। তারপরে দেশভাগ। জীবন্ত প্রেতের দেশ, সেখানে আলাদা করে আর ভূত দেখে ডরায় না কেউ। বেঁচে থাকাটাই তো ভয়ের ব্যাপার।
ইলিশ, ভূত এসব এখন বিলাসিতা।
ঘটনাটি কিন্তু মিথ্যে নয়। বলছিলেন রঞ্জনকৃষ্ণ ভট্টাচার্য। ডঃ ভুবনকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের মেজ ছেলে। ঠাকুরদাদার ঝুলিতে আর কী কী গল্প আছে কে জানে? ঠাকুরদাদার গল্প অবধিই আজ থাক তবে? ভূত ভবিষ্যৎ বিদেশ স্বদেশ রসে বশে থাক।
আমরা মনে রাখি অন্নের সুষম বন্টনেই মঙ্গল।
প্রকৃত রসমঙ্গল।
ধাঁধা
বৃষ্টি পড়লে টাপুর টুপুর নদেয় এলে বান
শাজাহানের বাপের পসন্দ রসবতীর জান।